শেষ হল ১৮তম ব্রিক্স সম্মেলন। রবিবার নয়াদিল্লিতে পর্দা নামার পর ধীরে ধীরে দেশে ফিরছেন আমন্ত্রিত রাষ্ট্রপ্রধানেরা। তবে সম্মেলন শেষ হলেও ভারতীয় কূটনীতির চর্চা থামছে না। গত তিন দিনে একাধিক রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান থেকে শুরু করে সংযুক্ত আরব আমিরশাহির নেতৃত্ব— একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রের সঙ্গে আলাদা করে আলোচনা হয়েছে তাঁর।
এ বারের ব্রিক্স হয়েছে অত্যন্ত জটিল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে। পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ, রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত, আমেরিকার শুল্কনীতি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ে অনিশ্চয়তার আবহে নয়াদিল্লির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল— ভিন্ন মেরুর দেশগুলিকে একই মঞ্চে এনে ঐকমত্য তৈরি করা। সেই জায়গা থেকেই ভারতের ঝুলিতে এল বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ‘রত্ন’।
এক, ইরান-আমিরশাহিকে একই বার্তায় আনা
ব্রিক্সের অন্যতম বড় কূটনৈতিক সাফল্য পশ্চিম এশিয়ার দুই গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহির মধ্যে ঐকমত্য তৈরি। যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে দুই দেশের সম্পর্ক অত্যন্ত স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছিল। কিন্তু ব্রিক্সের যৌথ ঘোষণায় দু’দেশই পশ্চিম এশিয়ায় সংযম, সাধারণ নাগরিকদের সুরক্ষা এবং কূটনীতির মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের পক্ষে সায় দিয়েছে। এই সমঝোতা তৈরির পিছনে প্রায় ১০০ ঘণ্টার কূটনৈতিক তৎপরতার কথাও উঠে এসেছে।
দুই, সন্ত্রাসবাদ নিয়ে কড়া বার্তা
ব্রিক্সের নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্রে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া হয়েছে। কোনও কারণ দেখিয়েই সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন করা যায় না— এমন বার্তা দেওয়া হয়েছে ঘোষণাপত্রে। ফলে সীমান্তপারের সন্ত্রাস নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ভারতের যে অবস্থান, তা বহুপাক্ষিক মঞ্চে আরও জোরালো হল।
তিন, পাকিস্তানের ব্রিক্স-প্রবেশে ধাক্কা
ব্রিক্সে পাকিস্তানের প্রবেশ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চলছে। কিন্তু এ বারও ইসলামাবাদ সেই মঞ্চে জায়গা পেল না। ব্রিক্সে নতুন সদস্য নেওয়ার ক্ষেত্রে ঐকমত্য প্রয়োজন হওয়ায় ভারতের আপত্তি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে চিন ও রাশিয়ার সঙ্গে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও ব্রিক্সের দরজা আপাতত ইসলামাবাদের জন্য বন্ধই রইল।
চার, শুল্ক-যুদ্ধের বিরুদ্ধে ভারতের অবস্থান প্রতিষ্ঠা
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতির জেরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তার বিরুদ্ধেও ব্রিক্স ঘোষণাপত্রে সরব হয়েছে সদস্য দেশগুলি। একতরফা শুল্ক ও বাণিজ্য-নিষেধাজ্ঞা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থাকে আরও নিয়মভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার পক্ষে সওয়াল করেছে ব্রিক্স।
পাঁচ, ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর নেতৃত্বে ভারতের দাবি আরও জোরালো
ব্রিক্সের মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশগুলির স্বার্থকে আরও জোরালো করার বার্তা দিয়েছে ভারত। রাষ্ট্রপুঞ্জ-সহ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলিতে উন্নয়নশীল দেশগুলির প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর পক্ষে সওয়াল করা হয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য, ডিজিটাল পরিকাঠামো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বাস্থ্য এবং শিল্পক্ষেত্রে সহযোগিতার মতো একাধিক ভারতীয় উদ্যোগও ঘোষণাপত্রে জায়গা পেয়েছে।
সব মিলিয়ে, যুদ্ধ ও বাণিজ্য-সংঘাতের আবহে অনুষ্ঠিত এ বারের ব্রিক্সকে নিছক একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন হিসেবে দেখছে না নয়াদিল্লি। ইরান-আমিরশাহির মধ্যে সংযমের বার্তা, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান, পাকিস্তানকে বাইরে রাখা, শুল্কনীতির বিরুদ্ধে বহুপাক্ষিক ঐকমত্য এবং ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর কণ্ঠস্বর জোরদার— এই পাঁচটি ক্ষেত্রেই ভারতের কূটনৈতিক সাফল্যের ছবি স্পষ্ট।