বিদ্যাসাগরের জন্মদিনে ‘নমো সেবা গাথা’! অজানা কাহিনির অভিনয় ও প্রতিযোগিতা কলকাতার শিক্ষা ভবনে


ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ২০৬তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে কলকাতার শিক্ষা ভবনে আয়োজিত অনুষ্ঠানকে ঘিরে তৈরি হল বিতর্ক। বিদ্যাসাগরকে স্মরণ করে শিক্ষকদের একাংশ বক্তব্য রাখার পরই শুরু হয় নাট্য প্রতিযোগিতা। কলকাতার বিভিন্ন স্কুলের পড়ুয়ারা সেই প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। অভিযোগ, সেখানে ‘নমো সেবা গাথা–অজানা কাহিনী’ নামে একটি নাটকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন ঘটনাকে তুলে ধরার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এমনকি এক পড়ুয়াকে মোদীর আদলে সাজিয়ে মঞ্চে উপস্থাপন করার কথাও বলা হয়।
দক্ষিণ কলকাতার শিক্ষা ভবনে বিদ্যাসাগরের ছবিকে সামনে রেখেই শনিবার এই নাট্য প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। বিভিন্ন স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা সেখানে অংশ নেয়। তার আগে গত বুধবারও কলকাতার একাধিক স্কুলে ‘নমো সেবা গাথা–অজানা কাহিনী’ মঞ্চস্থ হয়েছিল বলে স্কুলগুলির সূত্রে জানা গিয়েছে। অনুষ্ঠানটি নির্দিষ্ট নির্দেশ মেনে সম্পন্ন করার জন্য কর্তৃপক্ষের তরফে একাধিকবার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলেও দাবি স্কুলগুলির।
অভিযোগ, সেই চিত্রনাট্য অনুযায়ী কোথাও কোথাও ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগানও ওঠে। শনিবার শিক্ষা ভবনে আয়োজিত প্রতিযোগিতায় সেই নাটকেরই পরিবেশনা হয় বলে জানা গিয়েছে। নাটকের বিষয়বস্তুতে মূলত নরেন্দ্র মোদীর মুখ্যমন্ত্রী থেকে প্রধানমন্ত্রী হয়ে ওঠার রাজনৈতিক যাত্রাপথ এবং তাঁর সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরার নির্দেশ ছিল বলে অভিযোগ।
চিত্রনাট্য অনুযায়ী, এক মা ও তাঁর সন্তানের কথোপকথনের মাধ্যমে ‘মোদী গাথা’ তুলে ধরা হয়। গুজরাতে নরেন্দ্র মোদীর মুখ্যমন্ত্রী হওয়া থেকে শুরু করে দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর সময়কালের একাধিক ঘটনা নাটকের মাধ্যমে দেখানোর কথা ছিল। জঙ্গি দমন, সার্জিকাল স্ট্রাইক, কোভিড অতিমারির সময়কার পরিস্থিতি-সহ একাধিক বিষয়ও নাটকের বিভিন্ন দৃশ্যে তুলে ধরা হয় বলে জানা গিয়েছে।
শুধু ঘটনাপ্রবাহ নয়, নাটকের সংলাপ নিয়েও তৈরি হয়েছে বিতর্ক। চিত্রনাট্যের একটি অংশে এক অভিনেতাকে বলতে শোনা যায়, ‘‘আপনারা যদি দেশপ্রেমিক হন, তা হলে সকলে বলুন, মোদীজি আছেন বলেই...’’ এর পর দর্শকদের মধ্যে থেকে অন্য অভিনেতারা ‘সব সম্ভব’—অর্থাৎ ‘মোদী হ্যায় তো মুমকিন হ্যায়’ বলে সাড়া দেন বলে অভিযোগ।
নাটকের শেষের দিকেও রাজনৈতিক বার্তার উপস্থিতি ছিল বলে জানা গিয়েছে। রামমন্দির নির্মাণের কৃতিত্বও নরেন্দ্র মোদীর সরকারের সঙ্গে যুক্ত করে দেখানো হয়। সেই দৃশ্যে দর্শকের ভূমিকায় থাকা পড়ুয়ারা ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনি দেন বলে অভিযোগ। এরপর মোদীর সাজে থাকা এক পড়ুয়া সংলাপ বলেন—‘‘সৌগন্ধ আমাকে এই মাটির, আমি দেশ মিটতে দেব না, আমি দেশ ঝুঁকতে দেব না।’’
বিদ্যাসাগরের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত একটি সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনুষ্ঠানে এই ধরনের রাজনৈতিক চরিত্রায়ণ ও নাট্য প্রতিযোগিতা কেন রাখা হল, তা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে স্কুলপড়ুয়াদের দিয়ে কোনও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের জীবন ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে নাটকের মাধ্যমে উপস্থাপন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল কি না, তা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
যদিও স্কুলগুলির একাংশের দাবি, অনুষ্ঠানটি নিয়ে প্রশাসনিক মহলের তরফেই নির্দিষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। সেই নির্দেশ মেনেই সংশ্লিষ্ট নাটক প্রস্তুত ও মঞ্চস্থ করা হয়েছে। শিক্ষা ভবনের অনুষ্ঠানে শনিবার বিভিন্ন স্কুলের পড়ুয়ারা অংশ নেয়। এখন এই অনুষ্ঠানকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ নিয়ে স্কুলশিক্ষা দফতরের তরফে কী ব্যাখ্যা দেওয়া হয়, সে দিকেই নজর রয়েছে।

Post a Comment

Previous Post Next Post