শুধু জমি কেলেঙ্কারির অভিযোগ নয়, দলের সাংগঠনিক পদ পাওয়ার ক্ষেত্রেও নাকি ছিল ‘বিশেষ’ সমীকরণ। ‘স্যর’কে খুশি করতে পারলেই মিলত দলীয় পদ! আর সেই ‘খুশি’র সঙ্গে টাকার লেনদেনের অভিযোগও উঠছে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপ্ত সহায়ক সুমিত রায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর পূর্ব মেদিনীপুরের তৃণমূলের একাংশের নেতাকর্মীরা তাঁর বিরুদ্ধে মুখ খুলতেই সামনে আসছে এমনই একাধিক দাবি।
বিধানসভা নির্বাচনের আগে জেলায় তৃণমূলের সাংগঠনিক দুর্বলতার জন্যও সুমিতকেই দায়ী করছেন দলের পুরনো দিনের নেতা-কর্মীদের একাংশ। তাঁদের অভিযোগ, ২০২১ সালে রাজ্যে তৃতীয়বার তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর পূর্ব মেদিনীপুরে সুমিত রায়ের সক্রিয়তা উল্লেখযোগ্য ভাবে বাড়ে। জেলার বিভিন্ন সাংগঠনিক কমিটিতে অভিষেক-ঘনিষ্ঠ নেতাদের গুরুত্বও তখন বাড়তে শুরু করে।
তৃণমূলের একাংশের দাবি, সেই সময় দলের সাংগঠনিক পদ পাওয়ার ক্ষেত্রে সুমিতের ‘আশীর্বাদ’ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। এমনকি তাঁকে খুশি করেই অনেকে পদ পেয়েছেন বলেও অভিযোগ করেছেন দলেরই কয়েকজন নেতা। এই খুশির পিছনে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে। যদিও এই অভিযোগগুলির স্বাধীন ভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
রাজনৈতিক মহলে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গুরুত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর আপ্ত সহায়ক সুমিত রায়ের প্রভাবও পূর্ব মেদিনীপুরে বাড়তে থাকে বলে অভিযোগ। দলের একাংশের বক্তব্য, অভিষেকের কাছে জেলার খবর পৌঁছনোর ক্ষেত্রে সুমিত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন। সেই সূত্রেই জেলার সংগঠনে তাঁর প্রভাব ক্রমশ বাড়ে।
২০২৫ সালে পূর্ব মেদিনীপুরের জেলা নেতৃত্বে পরিবর্তনের প্রসঙ্গও টেনে আনছেন দলের পুরনো নেতারা। তাঁদের দাবি, প্রাক্তন মন্ত্রী সৌমেনকুমার মহাপাত্রকে জেলার দায়িত্ব থেকে সরিয়ে সুজিতকুমার রায়কে জেলা সভাপতি করার পিছনে সুমিত রায়ের সুপারিশ কাজ করেছিল। যদিও সুজিতকে জেলা সভাপতি হিসেবে মেনে নিতে দলের একাংশের আপত্তি ছিল বলেও দাবি করেছেন তাঁরা। তবে এই অভিযোগ নিয়েও প্রকাশ্যে কোনও প্রামাণ্য তথ্য সামনে আসেনি।
শুধু জেলা স্তরেই নয়, নন্দীগ্রামেও সুমিতের নিজস্ব প্রভাববলয় তৈরি হয়েছিল বলে অভিযোগ। তৃণমূলের পুরনো দিনের নেতাদের একাংশের দাবি, দলের সাংগঠনিক কাঠামোর পাশাপাশি নন্দীগ্রামে সুমিতকে ঘিরে একটি পৃথক ব্যক্তিগত বলয় তৈরি হয়েছিল। বিভিন্ন দলীয় কমিটিতে সেই বলয়ের প্রভাবও দেখা যেত বলে অভিযোগ।
নন্দীগ্রামের নব্য তৃণমূলের নেতারা সুমিত রায়কে ‘স্যর’ বলে সম্বোধন করতেন—এমন দাবিও করেছেন দলেরই কয়েকজন পুরনো নেতা। ফলে তাঁর গ্রেপ্তারির পর দলের আদি নেতৃত্বের একাংশ যে স্বস্তি প্রকাশ করছেন, তাঁদের সাম্প্রতিক মন্তব্যেই তা স্পষ্ট বলে দাবি রাজনৈতিক মহলের।
তবে সুমিত রায়ের বিরুদ্ধে ওঠা এই সমস্ত অভিযোগের ক্ষেত্রে তদন্তের ফলাফলই শেষ কথা বলবে। আপাতত তাঁর গ্রেপ্তারির পর তৃণমূলের অন্দরের ক্ষোভ ও পুরনো দ্বন্দ্বই প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে।