নতুন ভোটারদের ভোটার তালিকায় নাম তোলার বার্ষিক প্রক্রিয়া বা ‘স্পেশাল সামারি রিভিশন’ (এসএসআর) ঘিরে এ বার নির্বাচন কমিশনের অন্দরেই মতপার্থক্যের অভিযোগ প্রকাশ্যে এসেছে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের সঙ্গে দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিংহ সঁধু এবং বিবেক জোশীর মতবিরোধের খবর প্রকাশ্যে আসার পরেই বিষয়টি নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাল নির্বাচন সদন। নতুন প্রজন্মের ভোটারদের নাম অন্তর্ভুক্তিতে ইচ্ছাকৃত ভাবে গড়িমসি করা হচ্ছে বলে যে অভিযোগ উঠেছে, তা খারিজ করেছে কমিশন।
একটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ২০২৪ সালের পর থেকে দেশ জুড়ে নিয়মিত এসএসআর হয়নি। এর ফলে ১৮ বছর পূর্ণ করা বহু তরুণ-তরুণী ভোটার তালিকায় নিজেদের নাম তুলতে সমস্যায় পড়ছেন বলে অভিযোগ। এই বিষয়টি নিয়েই নির্বাচন কমিশনের অন্দরেও আপত্তি উঠেছিল বলে ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। সুখবীর সিংহ সঁধু এবং বিবেক জোশী নতুন ভোটারদের নাম অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে এই ‘ঢিলেমি’ নিয়ে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে তাঁদের আপত্তির কথা জানিয়েছিলেন বলেও দাবি করা হয়েছে।
সাধারণ নিয়মে ১৮ বছর বয়স পূর্ণ করা ভারতীয় নাগরিকেরা ফর্ম-৬ পূরণ করে ভোটার তালিকায় নিজেদের নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য আবেদন করতে পারেন। ভোটার তালিকা সংশোধনের নিয়মিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমেও নতুন ভোটারদের নাম যুক্ত হওয়ার কথা। ফলে এই প্রক্রিয়ায় কোনও দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হলে তার প্রভাব পড়তে পারে নতুন প্রজন্মের ভোটারদের উপর।
এই বিতর্কের মধ্যেই নির্বাচন কমিশনের তরফে পাল্টা পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়েছে। কমিশনের দাবি, ২০২৫ সালে ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ বা এসআইআর প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকে ১৮ থেকে ২৮ বছর বয়সি ২ কোটি ৭৩ লক্ষ ভোটারের নাম ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ, নতুন প্রজন্মের ভোটারদের নাম তোলার ক্ষেত্রে কমিশন কোনও ভাবেই নিষ্ক্রিয় ছিল না বলে তাদের বক্তব্য।
কমিশনের বক্তব্য, ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তি, সংশোধন কিংবা বাদ দেওয়ার মতো সমস্ত প্রক্রিয়াই নির্দিষ্ট আইন ও নিয়ম মেনেই করা হয়। ফলে নতুন ভোটারদের নাম যুক্ত করার ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃত ভাবে দেরি করা হচ্ছে—এমন অভিযোগের সঙ্গে কমিশন একমত নয়। বরং এসআইআর-সহ বিভিন্ন সংশোধন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নতুন ভোটারদের তালিকাভুক্ত করা হয়েছে বলে নির্বাচন সদনের দাবি।
তবে নির্বাচন কমিশনের অন্দরের মতবিরোধের অভিযোগ এখানেই শেষ নয়। এর আগে ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর একটি অন্তর্তদন্তমূলক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল, গত ১০ মাসে দুই নির্বাচন কমিশনার ফর্ম-৬-এর পরিবর্তন, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া বা নতুন নাম যুক্ত করা এবং সেন্ট্রাল ডেটাবেসে প্রবেশাধিকার সংক্রান্ত বিষয়ে অন্তত ১৪ বার ‘অন-রেকর্ড’ আপত্তি জানিয়েছেন। চিঠি লিখে কিংবা সরকারি ফাইলে নোট দিয়েই ওই আপত্তিগুলি জানানো হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।
এই অভিযোগগুলির জেরে নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। বিশেষ করে ভোটার তালিকা সংশোধন ও নতুন ভোটারদের নাম অন্তর্ভুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কমিশনের দুই সদস্যের আপত্তির খবর সামনে আসায় বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক মহলে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
যদিও নির্বাচন কমিশনের তরফে স্পষ্ট করে জানানো হয়েছে, ভোটার তালিকা সংক্রান্ত যাবতীয় সিদ্ধান্ত আইন এবং নির্ধারিত প্রক্রিয়া মেনেই নেওয়া হয়েছে। ফলে কমিশনের অন্দরে মতপার্থক্য থাকলেও তার প্রভাব ভোটার তালিকা তৈরির প্রক্রিয়ায় পড়েছে—এমন অভিযোগ কমিশন মানছে না।
নতুন প্রজন্মের ভোটারদের নাম অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নে এক দিকে কমিশনের পরিসংখ্যান, অন্য দিকে কমিশনের দুই সদস্যের আপত্তির অভিযোগ—দুইয়ের টানাপড়েনে বিতর্ক আরও জোরালো হয়েছে। এখন নজর থাকবে, আগামী দিনে এসএসআর প্রক্রিয়া এবং নতুন ভোটারদের নাম অন্তর্ভুক্তি নিয়ে নির্বাচন কমিশন কী পদক্ষেপ করে।