পুজোর আগেই চাকরি হারাচ্ছেন হাজারখানেক শিক্ষক! স্কুলে স্কুলে অনলাইন কাজ সামলাবে কে? বিপাকে প্রধানশিক্ষকেরা


পুজোর ঢাকে কাঠি পড়ার আগেই ফের চাকরি হারানোর আশঙ্কায় রাজ্যের একাংশ শিক্ষক। চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় রাজ্যের বিভিন্ন স্কুলে কর্মরত প্রায় ১,৪০০ জন কম্পিউটার শিক্ষক বা আইসিটি শিক্ষকের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ইতিমধ্যেই তাঁদের চুক্তি পুনর্নবীকরণের পরিবর্তে কাজের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা জানিয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে বলে অভিযোগ। আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর তাঁদের চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। এর পর স্কুলের যাবতীয় ডিজিটাল কাজ কী ভাবে সামলানো হবে, তা নিয়ে চিন্তায় পড়েছেন প্রধানশিক্ষকেরাও।
জানা গিয়েছে, ২০২২ সালের আগে-পরে একাধিক বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে পাঁচ বছরের চুক্তিতে রাজ্যের তিন হাজারেরও বেশি স্কুলে কম্পিউটার শিক্ষক নিয়োগ করা হয়েছিল। সেই নিয়োগের ক্ষেত্রে বিভিন্ন পর্যায়ে শিক্ষকদের কাজের মেয়াদ আলাদা সময়ে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কারও চুক্তির মেয়াদ চলতি বছর শেষ হচ্ছে, আবার কারও ক্ষেত্রে তা ২০২৭ সালের শুরু পর্যন্ত থাকার কথা। কিন্তু সম্প্রতি সংশ্লিষ্ট বেসরকারি সংস্থাগুলির তরফে প্রায় ১,৪০০ জন শিক্ষককে জানানো হয়েছে, আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর তাঁদের চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি ৯ অক্টোবরের মধ্যে যাবতীয় নথি এবং দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট সংস্থার কাছে হস্তান্তরের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে বলে দাবি শিক্ষকদের।
৬০ বছর পর্যন্ত কাজের সুযোগ, কিন্তু নতুনদের ক্ষেত্রে কেন নয়?
স্কুলে চুক্তির ভিত্তিতে কম্পিউটার শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল বাম আমল থেকেই। পরে রাজ্যে তৃণমূল সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিভিন্ন পর্যায়ে চুক্তিভিত্তিক কম্পিউটার শিক্ষকদের কাজের সুযোগ বাড়ানো হয়। প্রথম থেকে পঞ্চম পর্যায়ে যে শিক্ষকদের নিয়োগ করা হয়েছিল, তাঁদের ক্ষেত্রে পরবর্তী সময়ে ৬০ বছর বয়স পর্যন্ত কাজ করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে বলে দাবি শিক্ষকদের।
তবে ২০২২ সাল নাগাদ ষষ্ঠ ও সপ্তম পর্যায়ে যে কম্পিউটার শিক্ষক নিয়োগ করা হয়, তাঁদের এখনও স্থায়ী করা হয়নি। তাঁরা চুক্তিভিত্তিক কর্মী হিসাবেই কাজ করে যাচ্ছেন। শিক্ষকদের দাবি, এই দুই পর্যায়ের মধ্যে ষষ্ঠ পর্যায়ে নিযুক্ত প্রায় ১,৪০০ জন শিক্ষকই এখন চাকরি হারানোর আশঙ্কায় রয়েছেন।
বেতন কমার পর এ বার চাকরি নিয়েও অনিশ্চয়তা
চাকরি হারানোর আশঙ্কার পাশাপাশি গত কয়েক মাসে বেতন কমে যাওয়ার অভিযোগও তুলেছেন একাংশ কম্পিউটার শিক্ষক। তাঁদের দাবি, প্রায় হাজার টাকা পর্যন্ত বেতন কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। সরকারি নিয়মে পরিবর্তনের কারণ দেখিয়েই সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলি বেতন কমিয়েছে বলে অভিযোগ তাঁদের।
এর মধ্যেই চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার চিঠি হাতে আসায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে। শিক্ষকদের বক্তব্য, পুজোর মুখে হঠাৎ চাকরি চলে গেলে শুধু তাঁরা নন, তাঁদের পরিবারের সদস্যরাও আর্থিক সমস্যায় পড়বেন। দীর্ঘদিন স্কুলে কাজ করার পর আচমকা কর্মহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কায় তাঁরা সরকারের হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।
ডিজিটাল কাজ সামলাবে কে, প্রশ্ন প্রধানশিক্ষকদের
শুধু শিক্ষকদের চাকরি নয়, তাঁদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে রয়েছে স্কুলগুলির দৈনন্দিন কাজও। বর্তমানে স্কুলের বিভিন্ন সরকারি প্রকল্প, অনলাইন পোর্টালে তথ্য আপলোড, পড়ুয়া ও শিক্ষক সংক্রান্ত তথ্যের কাজ, বিভিন্ন রিপোর্ট তৈরি-সহ একাধিক প্রশাসনিক কাজ ডিজিটাল মাধ্যমে হয়। কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পের সঙ্গে স্কুলগুলির সংযোগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ধরনের অনলাইন কাজের চাপও বেড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে চুক্তিভিত্তিক কম্পিউটার শিক্ষকরাই বহু স্কুলে ডিজিটাল কাজের অন্যতম প্রধান ভরসা বলে দাবি প্রধানশিক্ষকদের একাংশের। ফলে হঠাৎ করে এত সংখ্যক শিক্ষক কাজ থেকে সরে গেলে স্কুলের প্রশাসনিক কাজ ব্যাহত হতে পারে বলে আশঙ্কা তাঁদের।
মথুরাপুর কৃষ্ণচন্দ্রপুর হাইস্কুলের প্রধানশিক্ষক এবং অ্যাডভান্সড সোসাইটি ফর হেডমাস্টার্স অ্যান্ড হেডমিস্ট্রেসেস-এর সাধারণ সম্পাদক চন্দন মাইতি বলেন, ক্লাস নেওয়ার পাশাপাশি স্কুলের একাধিক ডিজিটাল প্রকল্পের কাজও এই শিক্ষকেরাই সামলান। তাঁর কথায়, পুজোর আগে এ ভাবে চাকরি চলে গেলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও তাঁদের পরিবার যেমন সমস্যায় পড়বেন, তেমনই স্কুলগুলির পরিকাঠামো এবং প্রশাসনিক কাজও সমস্যার মুখে পড়বে।
চন্দন বলেন, বর্তমানে আপার আইডি কার্ডের কাজ চলছে। সেই কাজও মূলত এই শিক্ষকেরাই করছেন। তাঁরা না থাকলে স্কুল কর্তৃপক্ষ কী ভাবে এই কাজ সামলাবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিষয়টি জানিয়ে তিনি মুখ্যমন্ত্রীর কাছে ই-মেল করে হস্তক্ষেপের আবেদন জানিয়েছেন।
শিক্ষকদের দাবি, সরকারের আশ্বাসের পরও কাটেনি অনিশ্চয়তা
মথুরাপুর কৃষ্ণচন্দ্রপুর হাইস্কুলের আইসিটি শিক্ষক অভিষেক মণ্ডলের দাবি, প্রথম থেকে পঞ্চম পর্যায়ে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের পরবর্তী সময়ে ৬০ বছর পর্যন্ত কাজের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ষষ্ঠ ও সপ্তম পর্যায়ে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের ক্ষেত্রে এখনও সেই সুবিধা মেলেনি। ২০২২ সাল নাগাদ নিয়োগ হওয়া শিক্ষকদের একাংশই এখন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার কারণে সমস্যায় পড়েছেন।
মালদহের একটি স্কুলের শিক্ষক মহম্মদ উমর ফারুকের কথায়, পুজোর আগে চাকরি চলে গেলে গোটা পরিবার নিয়ে তাঁরা চরম সমস্যায় পড়বেন। তাঁর দাবি, রাজ্য সরকারের তরফে এ বিষয়ে দ্রুত সদর্থক পদক্ষেপ করা হোক।
অন্য দিকে, জলপাইগুড়ির একটি স্কুলে চুক্তির ভিত্তিতে কর্মরত জয়িতা মণ্ডল রায়ের দাবি, গত ২০ জুন স্কুলশিক্ষামন্ত্রী দীপক বর্মনের সঙ্গে দেখা করে তাঁরা তাঁদের সমস্যার কথা জানিয়েছিলেন। তখন আশ্বাসও দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি তাঁর। কিন্তু তার পরেও চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার বিজ্ঞপ্তি আসায় হতাশ তাঁরা।
এখন প্রায় ১,৪০০ জন কম্পিউটার শিক্ষকের চাকরি নিয়ে তৈরি হওয়া এই অনিশ্চয়তা কাটাতে রাজ্য সরকার কী পদক্ষেপ করে, সেটাই দেখার। একই সঙ্গে শিক্ষকদের দাবি, তাঁদের কর্মসংস্থানের বিষয়টি বিবেচনা করার পাশাপাশি স্কুলের ডিজিটাল কাজ যাতে কোনও ভাবেই ব্যাহত না হয়, সে বিষয়েও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হোক।

Post a Comment

Previous Post Next Post