২ লক্ষ কোটি ডলারেরও বেশি বাজারমূল্যকে লক্ষ্য করে শেয়ারবাজারে বড়সড় অভিষেকের প্রস্তুতি নিচ্ছে কৃত্রিম মেধা বা এআই-নির্ভর স্টার্টআপ সংস্থা অ্যানথ্রপিক। আগামী নভেম্বর নাগাদ আমেরিকার শেয়ারবাজারে সংস্থাটির তালিকাভুক্তি হতে পারে বলে জল্পনা রয়েছে। তবে আইপিও আসার আগেই সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের সামনে নিজেদের ব্যবসা এবং প্রযুক্তি ঘিরে একাধিক ঝুঁকির কথা তুলে ধরল এআই সংস্থাটি।
এআই মডেল ‘ক্লড’-এর নির্মাতা অ্যানথ্রপিক তাদের আইপিও সংক্রান্ত নথিতে প্রায় ৮০ পাতাজুড়ে বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকির বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছে। সেখানে সংস্থার পক্ষ থেকে এমন সম্ভাবনার কথাও স্বীকার করা হয়েছে যে, উন্নততর এআই মডেল তৈরি এবং তার দ্রুত অগ্রগতির ফলে ‘মানবজাতির জন্য বিপর্যয়কর বা অস্তিত্ব-সঙ্কটমূলক ঝুঁকি’ তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে যে গুরুতর এবং অনভিপ্রেত পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে, তাকেও ব্যবসায়িক ঝুঁকির অংশ হিসাবেই দেখিয়েছে সংস্থাটি।
অ্যানথ্রপিকের এই সতর্কবার্তা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ, এক দিকে যখন উন্নত এআই প্রযুক্তি নিয়ে বিশ্বজুড়ে বিপুল বিনিয়োগ এবং ব্যবসায়িক সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে, তখন সেই প্রযুক্তির নির্মাতাদেরই একাংশ তার সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে সতর্ক করছেন। আইপিওর আগে অ্যানথ্রপিকের নথিতে সেই আশঙ্কার উল্লেখ বিনিয়োগকারীদের কাছে প্রযুক্তিগত ঝুঁকির বিষয়টি আরও স্পষ্ট করে তুলতে পারে।
সংস্থার নথিতে সম্ভাব্য সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিগুলির উপরেও আলোকপাত করা হয়েছে। এআই প্রযুক্তি যত দ্রুত উন্নত হচ্ছে, মানুষের পক্ষে সেই প্রযুক্তির কার্যপ্রণালী বোঝা, নিয়ন্ত্রণ করা এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি সামলানো ততটাই কঠিন হয়ে উঠতে পারে— এমন আশঙ্কার কথাও উঠে এসেছে। ফলে শুধু আর্থিক বা ব্যবসায়িক ঝুঁকি নয়, এআই প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ প্রভাবকেও বিনিয়োগকারীদের বিবেচনায় রাখার বার্তা দিয়েছে অ্যানথ্রপিক।
এর কয়েক দিন আগেই সংস্থার সিইও দারিয়ো আমোদি এআই প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। প্রায় ৪,০০০ শব্দের একটি নিবন্ধে তিনি এআই সংস্থাগুলিকে প্রযুক্তির অগ্রগতির গতি নিয়ন্ত্রণে রাখার আহ্বান জানান। তাঁর বক্তব্য ছিল, মানুষের পক্ষে কৃত্রিম মেধাকে যে গতিতে বোঝা বা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, এআইয়ের অগ্রগতি তার থেকেও দ্রুত হয়ে যেতে পারে।
আমোদির সেই বক্তব্যের পরেই আইপিও সংক্রান্ত নথিতে এআইয়ের সম্ভাব্য বিপজ্জনক দিকগুলি নিয়ে এত বিস্তারিত সতর্কবার্তা সামনে আসায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে অ্যানথ্রপিক যখন বিপুল বাজারমূল্যকে লক্ষ্য করে শেয়ারবাজারে প্রবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন বিনিয়োগকারীদের কাছে ঝুঁকির বিষয়টি আগেভাগেই স্পষ্ট করার প্রয়োজনীয়তা দেখিয়েছে সংস্থাটি।
অ্যানথ্রপিক মূলত উন্নত কৃত্রিম মেধা মডেল তৈরির জন্য পরিচিত। তাদের ‘ক্লড’ সিরিজ়ের এআই মডেল বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে সংস্থার ব্যবসায়িক সম্ভাবনার পাশাপাশি তাদের তৈরি প্রযুক্তির নিরাপত্তা, নিয়ন্ত্রণ এবং ভবিষ্যৎ প্রভাব নিয়েও দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে।
আইপিওর আগে সংস্থার এই নথি সেই আলোচনাতেই নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এক দিকে অ্যানথ্রপিকের সম্ভাব্য বিপুল বাজারমূল্য নিয়ে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, অন্য দিকে সংস্থাটি নিজেই তার প্রযুক্তিকে ঘিরে সম্ভাব্য গুরুতর ঝুঁকির কথা বিনিয়োগকারীদের সামনে তুলে ধরেছে। ফলে এআইয়ের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার পাশাপাশি তার অনিশ্চয়তা এবং ঝুঁকিও যে শেয়ারবাজারে সংস্থাটির মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে, সেই ইঙ্গিতই মিলছে।