কলকাতা পুরসভায় আসন পুনর্বিন্যাস এবং মহিলা সংরক্ষণ নিয়ে একের পর এক অনিয়মের অভিযোগ উঠছে। এ বার সেই অভিযোগকে সামনে রেখে কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হওয়ার প্রস্তুতি শুরু করল বিরোধী শিবিরের একাধিক রাজনৈতিক দল। প্রদেশ কংগ্রেস, সিপিআইএম এবং কালীঘাট তৃণমূল—তিন পক্ষই পৃথক ভাবে পুরসভার আসন পুনর্বিন্যাসের পদ্ধতি এবং মহিলা সংরক্ষণের ক্ষেত্রে নিয়ম না মানার অভিযোগ তুলেছে। তাদের দাবি, এই প্রক্রিয়ায় সংবিধানের একাধিক ধারা এবং সংশ্লিষ্ট পুর আইন লঙ্ঘিত হচ্ছে।
অভিযোগকারীদের বক্তব্য, নতুন করে ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাসের ক্ষেত্রে একাধিক জায়গায় সীমানা নির্ধারণ নিয়ে গুরুতর আপত্তি রয়েছে। সেই আপত্তিগুলি খতিয়ে দেখতে এলাকায় গিয়ে ‘স্পট ভিজিট’ করার পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকদের মতামত জানার জন্য জনশুনানির প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বিরোধীদের দাবি, তাঁদের সেই প্রস্তাব যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের মতামত এবং বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা না করেই ওয়ার্ডের সীমানা পুনর্নির্ধারণ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এই বিষয়টি নিয়ে প্রদেশ কংগ্রেস, সিপিআইএম এবং কালীঘাট তৃণমূলের তরফে ইতিমধ্যেই একাধিক বার কলকাতা পুরসভার প্রশাসক তথা কমিশনার স্মিতা পাণ্ডেকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাসের পদ্ধতি নিয়ে আপত্তি জানানোর পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট এলাকায় গিয়ে সরেজমিনে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখার দাবি জানানো হয়েছে বলে বিরোধী শিবিরের দাবি।
শুধু ওয়ার্ডের সীমানা নির্ধারণ নয়, মহিলা সংরক্ষণ নিয়েও বড়সড় প্রশ্ন তুলেছে বিরোধীরা। তাঁদের অভিযোগ, সংসদে পাশ হওয়া নগরপালিকা সংক্রান্ত আইনের নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে কলকাতা পুরসভা এবং রাজ্যের নগরোন্নয়ন দফতর আসন সংরক্ষণের প্রক্রিয়া চালাচ্ছে না। বিশেষ করে কোন পদ্ধতিতে মহিলা সংরক্ষিত ওয়ার্ড নির্ধারণ করা হচ্ছে, সেই প্রক্রিয়াতেই একাধিক অসঙ্গতি রয়েছে বলে দাবি বিরোধীদের।
বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির বক্তব্য, গোটা প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ ভাবে হওয়া প্রয়োজন ছিল। কোনও ওয়ার্ডের সীমানা পরিবর্তন বা সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট এলাকার বাস্তব পরিস্থিতি এবং নাগরিকদের বক্তব্য বিবেচনা করা জরুরি। কিন্তু সেই নিয়ম যথাযথ ভাবে মানা হয়নি বলেই তাঁদের অভিযোগ।
তবে এখনই আদালতে মামলা দায়ের করছে না বিরোধীরা। কারণ, কলকাতা পুরসভার তরফে এখনও যে তালিকাগুলি প্রকাশ করা হয়েছে, সেগুলিকে ‘খসড়া তালিকা’ হিসাবেই দেখানো হচ্ছে। পুরসভার প্রশাসক এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকদের তরফে জানানো হয়েছে, চূড়ান্ত তালিকা এখনও প্রকাশিত হয়নি। সেই কারণেই চূড়ান্ত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে বাম এবং কংগ্রেস নেতৃত্ব।
বিরোধীদের বক্তব্য, খসড়া তালিকায় যে সমস্ত আপত্তি রয়েছে, সেগুলির ক্ষেত্রে চূড়ান্ত তালিকায় কোনও সংশোধন করা হয় কি না, তা আগে দেখা হবে। কিন্তু চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পরেও যদি একই ভাবে অনিয়ম বহাল থাকে, তা হলে আর প্রশাসনের কাছে অভিযোগ জানিয়ে বসে থাকা হবে না। সরাসরি কলকাতা হাই কোর্টে মামলা করা হবে।
একই অবস্থান নিয়েছে কালীঘাট তৃণমূলও। তাদের অভিযোগ, পুরসভার আসন পুনর্বিন্যাস এবং সংরক্ষণের ক্ষেত্রে নিয়ম ও সাংবিধানিক বিধি উপেক্ষা করা হচ্ছে। ফলে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর আইনি পথে যাওয়ার প্রস্তুতি তারাও নিচ্ছে।
ফলে কলকাতা পুরসভার আসন পুনর্বিন্যাস এবং মহিলা সংরক্ষণ নিয়ে রাজনৈতিক টানাপড়েন আরও বাড়তে চলেছে বলেই মনে করা হচ্ছে। চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর বিরোধীরা সত্যিই আদালতের দ্বারস্থ হয় কি না, এখন সে দিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের। মামলা হলে ওয়ার্ডের সীমানা পুনর্বিন্যাস থেকে শুরু করে সংরক্ষণের পদ্ধতি—পুরসভার একাধিক সিদ্ধান্তই আদালতের পর্যালোচনার আওতায় আসতে পারে।