# জিডিপি বিতর্কে স্বস্তি মোদী সরকারের, সংশোধিত হিসাব পদ্ধতি নিয়ে আইএমএফের মূল্যায়নে চাপে বিরোধীরা!
দেশের আর্থিক বৃদ্ধির হার নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই আন্তর্জাতিক অর্থভান্ডার বা আইএমএফের মূল্যায়নকে ঘিরে স্বস্তিতে নরেন্দ্র মোদী সরকার। ভারতের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বা জিডিপি (গ্রস ডোমেস্টিক প্রোডাক্ট) গণনার সংশোধিত পদ্ধতি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছে আইএমএফ। ফলে জিডিপির পরিসংখ্যান নিয়ে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের প্রেক্ষিতে নতুন করে রাজনৈতিক আলোচনা শুরু হয়েছে। যদিও জিডিপি গণনার পদ্ধতি আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া এবং প্রকাশিত বৃদ্ধির হার সম্পূর্ণ নির্ভুল হওয়া—দুটি আলাদা বিষয়। তাই আইএমএফের মূল্যায়নকে ঘিরে বিতর্কের অবসান হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে বিরোধীদের আন্দোলনের আবহেই দেশের অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান নিয়ে এই বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। কেন্দ্রের দাবি, ভারতীয় অর্থনীতির বৃদ্ধির গতি যথেষ্ট শক্তিশালী। অন্য দিকে, জিডিপির হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তুলে সরকারের প্রকাশিত পরিসংখ্যানের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন প্রাক্তন অর্থসচিব সুভাষচন্দ্র গর্গ। এই পরিস্থিতিতে ভারতের সংশোধিত মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে আইএমএফের পর্যবেক্ষণকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
**জুন ত্রৈমাসিকে ৭.৮ শতাংশ বৃদ্ধির দাবি কেন্দ্রের**
চলতি অর্থবর্ষ ২০২৬-২৭-এর প্রথম ত্রৈমাসিক, অর্থাৎ এপ্রিল থেকে জুন মাসের জিডিপির পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছিল কেন্দ্র। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ওই ত্রৈমাসিকে ভারতের অর্থনীতি ৭.৮ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই বৃদ্ধির পরিসংখ্যানকে দেশের অর্থনীতির শক্তিশালী অবস্থানের ইঙ্গিত হিসেবে তুলে ধরে কেন্দ্রীয় সরকার।
জিডিপি কোনও দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দেশের সীমানার ভিতরে উৎপাদিত পণ্য ও পরিষেবার মোট আর্থিক মূল্যকে কেন্দ্র করেই এই হিসাব তৈরি হয়। অর্থনীতির বৃদ্ধি, উৎপাদন, বিনিয়োগ এবং সামগ্রিক আর্থিক পরিস্থিতি বোঝার ক্ষেত্রে জিডিপির পরিসংখ্যান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই এই সূচকের হিসাব নিয়ে কোনও প্রশ্ন উঠলে তা অর্থনৈতিক মহলের পাশাপাশি রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।
কেন্দ্রের প্রকাশিত বৃদ্ধির হার সামনে আসার পরেই অবশ্য সংশ্লিষ্ট পরিসংখ্যান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন প্রাক্তন অর্থসচিব সুভাষচন্দ্র গর্গ। তাঁর দাবি, ভারতের প্রকৃত জিডিপি বৃদ্ধির হার মাত্র ২.৬ শতাংশের কাছাকাছি। তাঁর অভিযোগ, সরকারি পরিসংখ্যানে অর্থনৈতিক বৃদ্ধির প্রকৃত চিত্র প্রতিফলিত হচ্ছে না। বরং হিসাবের পদ্ধতি এবং তথ্যের উপস্থাপনার কারণে বৃদ্ধির হার বাস্তবের তুলনায় অনেক বেশি বলে মনে হচ্ছে।
**জিডিপির হিসাব নিয়ে কেন বিতর্ক?**
জিডিপি গণনার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত পদ্ধতি, মূল্যায়নের ভিত্তি এবং সংশ্লিষ্ট তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে আলোচনা নতুন নয়। কোনও দেশের অর্থনীতির প্রকৃত অবস্থা বোঝার জন্য শুধু বৃদ্ধির হার দেখলেই হয় না, সেই হার কী ভাবে গণনা করা হয়েছে, কোন তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে এবং আগের সময়ের সঙ্গে তুলনার ভিত্তি কী ছিল, সেগুলিও গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতের জিডিপি বৃদ্ধির হার নিয়ে বিতর্কের ক্ষেত্রেও এই প্রশ্নগুলি সামনে এসেছে। সরকারি পরিসংখ্যান এবং সুভাষচন্দ্র গর্গের উত্থাপিত বিকল্প হিসাবের মধ্যে বড় ব্যবধান থাকায় স্বাভাবিক ভাবেই সংশ্লিষ্ট পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। তবে সরকারি হিসাবের বিপরীতে ২.৬ শতাংশ বৃদ্ধির যে দাবি করা হয়েছে, তার ভিত্তি ও গণনাপদ্ধতি বিস্তারিত ভাবে বিচার না করে কোনও একটি সংখ্যাকে চূড়ান্ত সত্য বলে ধরে নেওয়া যায় না।
এখানেই আন্তর্জাতিক অর্থভান্ডারের মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভারতের সংশোধিত জিডিপি মূল্যায়ন পদ্ধতি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে আইএমএফের পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের অবস্থানকে কিছুটা শক্তিশালী করেছে। তবে কোনও পরিসংখ্যান তৈরির পদ্ধতি আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে স্বীকৃতি পাওয়া মানেই সেই পদ্ধতিতে তৈরি প্রতিটি হিসাব বা প্রতিটি বৃদ্ধির পূর্বাভাস নিয়ে আর কোনও প্রশ্ন থাকতে পারে না, এমনটা নয়।
**সংশোধিত পদ্ধতি নিয়ে আইএমএফের পর্যবেক্ষণ**
জিডিপির হিসাব তৈরির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে চলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন দেশের অর্থনীতির মধ্যে তুলনা করতে গেলে পরিসংখ্যান তৈরির পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট সামঞ্জস্য থাকা প্রয়োজন। সেই কারণেই আন্তর্জাতিক অর্থভান্ডারের মতো সংস্থার মূল্যায়নকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ভারতের সংশোধিত মূল্যায়ন পদ্ধতিকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছে আইএমএফ। কেন্দ্রের পক্ষে এই পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জিডিপির হিসাব নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের মধ্যেই আন্তর্জাতিক সংস্থার এই মূল্যায়ন সামনে এসেছে।
তবে আইএমএফের পর্যবেক্ষণের সুনির্দিষ্ট পরিধি বোঝা প্রয়োজন। কোনও সংস্থা পরিসংখ্যান তৈরির পদ্ধতি মূল্যায়ন করলে তার অর্থ এই নয় যে, সেই পদ্ধতির মাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিটি পরিসংখ্যানের সব দিক নিয়ে সংস্থাটি নিঃশর্ত সমর্থন জানিয়েছে। ফলে ভারতের জিডিপি বৃদ্ধির হার নিয়ে বিতর্কের ক্ষেত্রে আইএমএফের বক্তব্যকে কী ভাবে ব্যাখ্যা করা হবে, তা নির্ভর করছে সংশ্লিষ্ট মূল্যায়নের বিস্তারিত বিবরণের উপর।
**রাজনৈতিক বিতর্কে নতুন মাত্রা**
দেশের অর্থনীতির বৃদ্ধির হার নিয়ে বিতর্কের রাজনৈতিক তাৎপর্যও কম নয়। কেন্দ্রের আর্থিক নীতি এবং অর্থনৈতিক সাফল্য নিয়ে শাসক ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই মতপার্থক্য রয়েছে। জিডিপির পরিসংখ্যান সেই রাজনৈতিক বিতর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
এক দিকে, সরকার ৭.৮ শতাংশ বৃদ্ধির পরিসংখ্যান তুলে ধরে অর্থনীতির শক্তিশালী অবস্থানের কথা বলছে। অন্য দিকে, প্রাক্তন অর্থসচিব সুভাষচন্দ্র গর্গের মতো প্রাক্তন প্রশাসনিক আধিকারিকের প্রশ্ন তোলায় সরকারি হিসাবের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে আইএমএফের মূল্যায়ন কেন্দ্রের জন্য স্বস্তির কারণ হতে পারে।
তবে জিডিপি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের নিষ্পত্তি শুধুমাত্র আন্তর্জাতিক সংস্থার একটি পর্যবেক্ষণের উপর নির্ভর করে না। প্রকাশিত তথ্যের স্বচ্ছতা, হিসাবের পদ্ধতি, তথ্যের উৎস এবং বিকল্প হিসাবের যুক্তি—সব কিছুই খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। অর্থনীতির প্রকৃত অবস্থা বুঝতে হলে সরকারি পরিসংখ্যানের পাশাপাশি কর্মসংস্থান, উৎপাদন, বিনিয়োগ, মূল্যবৃদ্ধি এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মতো বিষয়গুলিও বিবেচনায় রাখতে হয়।
**বিতর্কের অবসান, নাকি নতুন প্রশ্ন?**
জিডিপির হিসাব নিয়ে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের আবহে আইএমএফের মূল্যায়ন নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। ভারতের সংশোধিত মূল্যায়ন পদ্ধতি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হলে তা কেন্দ্রের অবস্থানকে সমর্থন করার মতো একটি বিষয় হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু সেই মূল্যায়নকে ভিত্তি করে সরকারি বৃদ্ধির হার এবং বিকল্প হিসাবের মধ্যে থাকা ব্যবধানের সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা পাওয়া যায় কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে, ভারতের জিডিপি বৃদ্ধির হার নিয়ে বিতর্ক এখন অর্থনৈতিক হিসাবের পাশাপাশি রাজনৈতিক আলোচনারও কেন্দ্রে। কেন্দ্রের প্রকাশিত ৭.৮ শতাংশ বৃদ্ধির পরিসংখ্যান এবং সুভাষচন্দ্র গর্গের দাবি করা ২.৬ শতাংশ বৃদ্ধির মধ্যে ব্যবধানের কারণ কী, তা স্পষ্ট করতে হলে সংশ্লিষ্ট তথ্য ও গণনাপদ্ধতির বিস্তারিত বিশ্লেষণ প্রয়োজন। আইএমএফের মূল্যায়ন এই আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করলেও, জিডিপি বিতর্কের সব প্রশ্নের উত্তর মিলেছে কি না, তা নির্ধারণ করতে আরও বিস্তারিত তথ্যের প্রয়োজন রয়েছে।