ফ্রান্সে নজিরবিহীন বিক্ষোভ, দু’সপ্তাহে ধৃত সাড়ে ছ’হাজার! ‘একটা ঐতিহ্যশালী দেশের দখল নিতে চাইছে ইসলাম’, দাবি ট্রাম্পের


স্কুলে পর্যাপ্ত সরকারি অনুদান, জরাজীর্ণ শ্রেণিকক্ষের সংস্কার, পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ-সহ একাধিক দাবিতে গত সেপ্টেম্বর থেকেই ফ্রান্সের বিভিন্ন প্রান্তে যে অসন্তোষের সূত্রপাত হয়েছিল, মঙ্গলবার তা কার্যত নজিরবিহীন গণবিক্ষোভের রূপ নিল। দেশজুড়ে রাস্তায় নামলেন বিপুল সংখ্যক পড়ুয়া, শিক্ষক এবং অভিভাবক। ফরাসি সরকারের হিসাব অনুযায়ী, মঙ্গলবারের বিক্ষোভে আড়াই লক্ষেরও বেশি মানুষ অংশ নেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে একাধিক জায়গায় পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ বাধে। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস, রবার বুলেট এবং গ্রেনেড ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে।
এই আন্দোলন ঘিরে ইতিমধ্যেই উত্তপ্ত ফ্রান্সের রাজনৈতিক পরিস্থিতি। প্রশাসনের দাবি, গত দু’সপ্তাহে বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের ঘটনায় সাড়ে ছ’হাজারেরও বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে। আন্দোলনের পরিধি যত বাড়ছে, ততই তা নিয়ে রাজনৈতিক চাপানউতোর তীব্র হচ্ছে। আর সেই আবহেই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
সমাজমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক বার্তায় ট্রাম্প দাবি করেছেন, ফ্রান্সের বর্তমান অস্থিরতার নেপথ্যে শুধু শিক্ষা সংক্রান্ত সমস্যা নেই। তাঁর অভিযোগ, ‘অনিয়ন্ত্রিত গণ-অভিবাসন’-এর মাধ্যমে একটি ঐতিহ্যশালী দেশের নিয়ন্ত্রণ বা দখল নেওয়ার চেষ্টা চলছে। এই প্রসঙ্গে তিনি ইসলামের দিকে সরাসরি আঙুল তুলেছেন। ট্রাম্পের বক্তব্য ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক।
ট্রাম্পের এই মন্তব্যের পরই ফ্রান্সের অভ্যন্তরীণ আন্দোলন আন্তর্জাতিক রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। সমালোচকদের একাংশের বক্তব্য, শিক্ষা ও সরকারি বাজেট সংক্রান্ত দাবিকে ধর্মীয় বা অভিবাসন-সংক্রান্ত বিতর্কের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করতে পারে। ফরাসি প্রশাসনের তরফেও ট্রাম্পের বক্তব্যের সঙ্গে আন্দোলনের বাস্তব কারণের কোনও মিল নেই বলে দাবি করা হয়েছে।
আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, বছরের পর বছর ধরে বহু সরকারি স্কুলে পরিকাঠামোগত সমস্যা রয়েছে। কোথাও জরাজীর্ণ শ্রেণিকক্ষ, কোথাও পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই, আবার কোথাও শিক্ষার্থীর সংখ্যার তুলনায় প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা অত্যন্ত কম। এর পাশাপাশি সরকারি বাজেটে শিক্ষা খাতে কাটছাঁটের সম্ভাবনাও ক্ষোভ বাড়িয়েছে। ফলে শিক্ষার মান এবং সরকারি স্কুলগুলির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ থেকেই এই আন্দোলনের সূত্রপাত বলে দাবি আন্দোলনকারীদের।
গত সেপ্টেম্বর থেকে ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে ছোট ছোট বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল। সময়ের সঙ্গে সেই আন্দোলনে যোগ দিতে থাকেন শিক্ষক, পড়ুয়া, অভিভাবক এবং শিক্ষা ক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন সংগঠন। মঙ্গলবার সেই বিক্ষোভই বড় আকার নেয়। একাধিক গুরুত্বপূর্ণ শহরে রাস্তা অবরোধ, মিছিল এবং অবস্থান-বিক্ষোভ হয়। কোথাও কোথাও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে পুলিশ হস্তক্ষেপ করে।
পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশের কাঁদানে গ্যাস, রবার বুলেট এবং গ্রেনেড ব্যবহারের অভিযোগ সামনে এসেছে। অন্য দিকে, প্রশাসনের দাবি, কিছু জায়গায় বিক্ষোভকারীদের একাংশ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিঘ্নিত করেছে। ফলে পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশকে কঠোর পদক্ষেপ করতে হয়েছে।
সব মিলিয়ে গত দু’সপ্তাহে হাজার হাজার মানুষকে আটক করা হয়েছে বলে প্রশাসনিক সূত্রে খবর। এই বিপুল সংখ্যক আটকের ঘটনা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। মানবাধিকার কর্মী এবং আন্দোলনকারীদের একাংশের অভিযোগ, সরকার শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ দমনের চেষ্টা করছে। যদিও প্রশাসনের বক্তব্য, জননিরাপত্তা এবং আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা হয়েছে।
এদিকে, ট্রাম্পের মন্তব্যকে কেন্দ্র করে ফ্রান্সের বাইরে ইউরোপের রাজনৈতিক মহলেও বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিশেষ করে অভিবাসন ও ইসলাম প্রসঙ্গ টেনে এনে একটি শিক্ষা আন্দোলনকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা কতটা যুক্তিযুক্ত, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। আন্দোলনকারী পড়ুয়া সংগঠনগুলির দাবি, তাঁদের লড়াই কোনও ধর্ম বা সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে নয়। তাঁদের মূল দাবি সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতি এবং পড়ুয়াদের জন্য নিরাপদ ও উন্নত পরিবেশ নিশ্চিত করা।
ফ্রান্সের রাজনৈতিক পরিস্থিতির পাশাপাশি আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রেক্ষিতেও ট্রাম্পের মন্তব্যকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। আমেরিকায় আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে অভিবাসন, জাতীয় পরিচয় এবং ইসলাম প্রসঙ্গ ট্রাম্পের রাজনৈতিক বক্তব্যে বারবার উঠে আসছে। ফলে ফ্রান্সের চলতি বিক্ষোভ নিয়েও তাঁর মন্তব্যকে সেই বৃহত্তর রাজনৈতিক অবস্থানের অংশ হিসাবেই দেখছেন পর্যবেক্ষকদের একাংশ।
তবে ট্রাম্পের বক্তব্যের জেরে ফ্রান্সের আন্দোলনের মূল দাবি যাতে আড়ালে চলে না যায়, সে বিষয়েও সতর্ক করেছেন আন্দোলনকারীরা। তাঁদের বক্তব্য, স্কুলের পরিকাঠামো, শিক্ষক নিয়োগ এবং শিক্ষা খাতে সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো—এই তিনটি বিষয়ই তাঁদের আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু। ধর্মীয় মেরুকরণ বা অভিবাসন নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের সঙ্গে এই আন্দোলনের কোনও সম্পর্ক নেই।
ফলে এক দিকে শিক্ষা ও সরকারি বাজেট ঘিরে ফ্রান্সে ক্রমশ তীব্র হচ্ছে জনঅসন্তোষ, অন্য দিকে সেই আন্দোলনকে ঘিরে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক চাপানউতোরও বাড়ছে। পুলিশি ধরপাকড়, সংঘর্ষ এবং ট্রাম্পের বিস্ফোরক মন্তব্য—সব মিলিয়ে ফ্রান্সের এই আন্দোলন এখন শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

Post a Comment

Previous Post Next Post