‘অত্যন্ত আপত্তিজনক’! এইচ১-বি ভিসা নিয়ে আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট ভান্সের মন্তব্যের বিরোধিতা নয়াদিল্লির


‘অত্যন্ত আপত্তিজনক ও অযৌক্তিক’! এইচ-১বি ভিসা নিয়ে জেডি ভান্সের মন্তব্যে ক্ষুব্ধ নয়াদিল্লি, আমেরিকাকে কড়া বার্তা ভারতের

এইচ-১বি ভিসায় কর্মরত বিদেশি পেশাদারদের নিয়ে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্সের মন্তব্য ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হল ভারত ও আমেরিকার মধ্যে। গ্রিন কার্ড এবং পার্মানেন্ট লেবার সার্টিফিকেশন (পিইআরএম) প্রক্রিয়া নিয়ে ভান্সের মন্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করল নয়াদিল্লি। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্টের বক্তব্যকে ‘অত্যন্ত আপত্তিজনক’ এবং ‘অযৌক্তিক’ বলে উল্লেখ করে ভারতীয় পেশাদারদের অবদানকে খাটো করে দেখানোর বিরুদ্ধেও সরব হয়েছে বিদেশ মন্ত্রক। নয়াদিল্লির স্পষ্ট বক্তব্য, ভারতীয় দক্ষ কর্মীদের অবদানকে এ ভাবে ব্যাখ্যা করা কোনও ভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। দুই দেশের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার ক্ষেত্রে দক্ষ কর্মীদের যাতায়াত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেও মনে করিয়ে দিয়েছে ভারত।

উল্লেখ্য, এইচ-১বি ভিসায় আমেরিকায় কর্মরত বিদেশি কর্মীদের ‘চুক্তিবদ্ধ বিদেশি শ্রমিক’ বলে উল্লেখ করেন ভান্স। শুধু তা-ই নয়, এই ভিসা কর্মসূচি ব্যবহার করে যে সব সংস্থা বিদেশি কর্মী নিয়োগ করে, তাদের ‘ভিসা তৈরির কারখানা’ বলেও কটাক্ষ করেন তিনি। তাঁর এই মন্তব্যের পরেই বিষয়টি নিয়ে আপত্তি জানায় নয়াদিল্লি। ভারতের বক্তব্য, এইচ-১বি ভিসার মাধ্যমে দক্ষ বিদেশি পেশাদারদের নিয়োগের বিষয়টিকে কেবল শ্রমিক নিয়োগের সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচার করা উচিত নয়। বিশেষ করে প্রযুক্তি, গবেষণা এবং অন্যান্য উচ্চদক্ষতাসম্পন্ন ক্ষেত্রে ভারতীয় পেশাদারদের অবদান দীর্ঘদিনের।

বিদেশ মন্ত্রকের তরফে জারি করা বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মেধার আদান-প্রদান ভারত ও আমেরিকা, দুই দেশের অর্থনীতিকেই শক্তিশালী করে। এই প্রক্রিয়ায় শুধু ভারতীয় কর্মীরাই উপকৃত হন না, লাভবান হয় আমেরিকার বিভিন্ন সংস্থা এবং বৃহত্তর অর্থনীতিও। দক্ষ ভারতীয় পেশাদারেরা দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন প্রযুক্তিক্ষেত্র, শিল্প এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত থেকে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলেছেন। ফলে তাঁদের কাজকে নেতিবাচক ভাবে তুলে ধরা বা তাঁদের অবদানকে ছোট করে দেখা ভারতের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।

নয়াদিল্লির মতে, ভারতীয় পেশাদারদের দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতা মার্কিন সংস্থাগুলির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে উন্নত প্রযুক্তি, গবেষণা এবং উদ্ভাবনের সঙ্গে যুক্ত সংস্থাগুলির দক্ষ কর্মীর প্রয়োজন হয়। সেই জায়গায় ভারতীয় পেশাদারেরা দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। তাঁদের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে প্রযুক্তিগত জ্ঞান, অভিজ্ঞতা এবং দক্ষতার আদান-প্রদানও সম্ভব হচ্ছে। তাই এই ব্যবস্থাকে একতরফা সুবিধা হিসেবে দেখার পরিবর্তে পারস্পরিক লাভের ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা উচিত বলেই মনে করছে ভারত।

বিদেশ মন্ত্রকের বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, ভারত ও আমেরিকার মধ্যে মেধার আদান-প্রদানের বিষয়টি দুই দেশের কাছেই লাভজনক। এই ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত সব পক্ষের কাছ থেকেই বিষয়টি সম্পর্কে যথাযথ উপলব্ধি প্রত্যাশা করে নয়াদিল্লি। ভারতের বক্তব্য, দক্ষ কর্মীদের অবদান এবং দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের গুরুত্ব বিবেচনা না করে কোনও মন্তব্য বা পদক্ষেপ করা হলে তার প্রভাব দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার উপরেও পড়তে পারে।

এদিকে, আমেরিকার সাম্প্রতিক পদক্ষেপ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ভারত। নয়াদিল্লির আশঙ্কা, এইচ-১বি ভিসা এবং সংশ্লিষ্ট অভিবাসন প্রক্রিয়াকে ঘিরে কঠোর অবস্থান নেওয়া হলে দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থরক্ষার ক্ষেত্রে বাধা তৈরি হতে পারে। বিশেষত, আমেরিকায় কর্মরত ভারতীয় পেশাদারদের ভবিষ্যৎ এবং মার্কিন সংস্থাগুলির সঙ্গে তাঁদের দীর্ঘদিনের পেশাগত সম্পর্কের বিষয়টি যথেষ্ট সংবেদনশীল। সেই কারণে এই ধরনের নীতিগত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সব দিক বিবেচনা করার প্রয়োজন রয়েছে বলেই মনে করছে ভারত।

তবে পিইআরএম প্রক্রিয়ায় স্থগিতাদেশের প্রভাব নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও স্পষ্ট করেছে বিদেশ মন্ত্রক। মন্ত্রকের বিবৃতি অনুযায়ী, এই প্রক্রিয়ায় স্থগিতাদেশের ফলে বর্তমানে বৈধ এইচ-১বি ভিসাধারীদের বৈধ অবস্থান সরাসরি প্রভাবিত হবে না। তাঁদের পরিবারের সদস্যদের বৈধ অবস্থানও এর ফলে সরাসরি প্রভাবিত হওয়ার কথা নয়। অর্থাৎ, পিইআরএম প্রক্রিয়া সংক্রান্ত পদক্ষেপ এবং বর্তমানে বৈধ এইচ-১বি ভিসার ভিত্তিতে আমেরিকায় বসবাসের বিষয়টিকে এক করে দেখছে না নয়াদিল্লি।

প্রসঙ্গত, এইচ-১বি ভিসা আমেরিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসংস্থানভিত্তিক ভিসা কর্মসূচি, যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট বিশেষায়িত পেশায় বিদেশি দক্ষ কর্মীদের নিয়োগ করা হয়। ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী এবং অন্যান্য দক্ষ পেশাদারদের একটি বড় অংশ এই ভিসার মাধ্যমে আমেরিকায় কাজ করেন। অন্য দিকে, পিইআরএম হল আমেরিকায় কর্মসংস্থানভিত্তিক গ্রিন কার্ডের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ শ্রম-প্রত্যয়ন প্রক্রিয়া। এই দুই ব্যবস্থাকে ঘিরে মার্কিন প্রশাসনের অবস্থান এবং রাজনৈতিক মহলের মন্তব্য তাই ভারতীয় পেশাদারদের কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

সব মিলিয়ে, এইচ-১বি ভিসা নিয়ে জেডি ভান্সের মন্তব্যকে কেন্দ্র করে ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে। এক দিকে আমেরিকায় বিদেশি কর্মী নিয়োগ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক, অন্য দিকে ভারতীয় দক্ষ পেশাদারদের অবদান এবং দুই দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ—সব মিলিয়ে বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নয়াদিল্লির কড়া প্রতিক্রিয়ায় স্পষ্ট, ভারতীয় পেশাদারদের অবদানকে খাটো করে দেখানোর যে কোনও প্রচেষ্টার বিরোধিতা করবে ভারত। একই সঙ্গে দুই দেশের পারস্পরিক লাভের বিষয়টি মাথায় রেখে এই সংবেদনশীল ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল অবস্থান নেওয়ার প্রত্যাশাও জানিয়েছে বিদেশ মন্ত্রক।

Post a Comment

Previous Post Next Post