‘আমাদের ক্যামেরার নজর তীক্ষ্ণ’, অস্ট্রেলিয়ার ‘স্যান্ডপেপারগেট’ বিতর্ক মনে করিয়ে টেস্ট সিরিজ়ের আগে প্যাট কামিন্সদের খোঁচা দক্ষিণ আফ্রিকার সম্প্রচারকারী চ্যানেলের!
আট বছর আগের বল বিকৃতি বিতর্ক এখনও তাড়া করে বেড়াচ্ছে অস্ট্রেলিয়াকে। দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে টেস্ট সিরিজ় শুরুর আগেই সেই পুরনো ক্ষতে খোঁচা দিল সে দেশের সম্প্রচারকারী সংস্থা সুপারস্পোর্ট। তিন ম্যাচের টেস্ট সিরিজ়ের প্রচারে অস্ট্রেলিয়াকে সতর্ক করে তাদের বার্তা, ‘আমাদের ক্যামেরার নজর অত্যন্ত তীক্ষ্ণ।’ এই মন্তব্য ঘিরেই নতুন করে চর্চা শুরু হয়েছে ক্রিকেটমহলে।
২০১৮ সালের পর আবার দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে টেস্ট সিরিজ় খেলতে নামছে অস্ট্রেলিয়া। আর সিরিজ় শুরুর আগেই সামনে চলে এসেছে সেই বছরের কেপ টাউন টেস্টের কুখ্যাত বল বিকৃতি বিতর্ক। ক্রিকেটবিশ্বে যা ‘স্যান্ডপেপারগেট’ নামে পরিচিত। সেই ঘটনায় অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটীয় সততা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। এবার সেই অতীতের কথা মনে করিয়েই প্যাট কামিন্সদের সতর্ক করে দিল দক্ষিণ আফ্রিকার সম্প্রচারকারী সংস্থা সুপারস্পোর্ট।
শুক্রবার থেকে শুরু হওয়ার কথা দক্ষিণ আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়ার প্রথম টেস্ট। তার আগে তিন ম্যাচের সিরিজ়কে কেন্দ্র করে একটি প্রচারমূলক ভিডিয়ো তৈরি করেছে সুপারস্পোর্ট। সমাজমাধ্যমে সেই ভিডিয়ো প্রকাশ্যে আসতেই নজর কেড়েছে সম্প্রচারকারী সংস্থার বার্তা। সেখানে অস্ট্রেলিয়াকে উদ্দেশ করে বলা হয়েছে, ‘‘আমাদের ক্যামেরার নজর অত্যন্ত তীক্ষ্ণ।’’ ক্রিকেটমহলের একাংশের মতে, এটি নিছক প্রচারমূলক মন্তব্য নয়। বরং আট বছর আগের বল বিকৃতি কাণ্ডের কথা মনে করিয়ে দিয়ে অস্ট্রেলীয় দলকে কার্যত খোঁচা দেওয়া হয়েছে।
কী হয়েছিল ২০১৮ সালের কেপ টাউন টেস্টে?
২০১৮ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ টাউনের নিউল্যান্ডস মাঠে মুখোমুখি হয়েছিল অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকা। সেই টেস্টেই বল বিকৃতির অভিযোগে তীব্র বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে অস্ট্রেলিয়া। অভিযোগ ওঠে, বলের পালিশ নষ্ট করে সুইংয়ে সুবিধা পাওয়ার উদ্দেশ্যে বলের উপর ঘষা হয়েছিল সিরিশ কাগজ। এই ঘটনায় নাম জড়িয়েছিল অস্ট্রেলিয়ার তৎকালীন ক্রিকেটার ক্যামেরন ব্যানক্রফটের।
ম্যাচ চলাকালীন ফিল্ডিং করার সময় ব্যানক্রফটকে একটি ছোট হলুদ বস্তু দিয়ে বলের উপর ঘষতে দেখা যায়। পরে সেটি পকেটে ঢুকিয়ে রাখেন তিনি। ঘটনাটি মাঠের জায়ান্ট স্ক্রিনে ধরা পড়তেই সন্দেহ তৈরি হয়। অস্ট্রেলিয়ার তৎকালীন কোচ ড্যারেন লেম্যানও বিষয়টি নিয়ে সতর্ক হয়ে ওঠেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে দ্বাদশ ব্যক্তি পিটার হ্যান্ডসকম্বকে মাঠে পাঠিয়ে ক্রিকেটারদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছিল বলে জানা যায়।
কিন্তু তত ক্ষণে ঘটনাটি ক্রিকেটবিশ্বের নজরে চলে এসেছে। পরবর্তী সময়ে বল বিকৃতির ঘটনায় ব্যানক্রফটের পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়ার তৎকালীন অধিনায়ক স্টিভ স্মিথ এবং সহ-অধিনায়ক ডেভিড ওয়ার্নারের নামও জড়ায়। ঘটনার জেরে অস্ট্রেলীয় দলের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্রিকেটের অন্যতম বিতর্কিত অধ্যায় হিসেবে জায়গা করে নেয় ‘স্যান্ডপেপারগেট’।
শাস্তির মুখে স্মিথ, ওয়ার্নার ও ব্যানক্রফট
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট বোর্ড ক্রিকেটারদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ করে। স্টিভ স্মিথ ও ডেভিড ওয়ার্নারকে এক বছরের জন্য আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে নির্বাসিত করা হয়েছিল। অন্য দিকে, ক্যামেরন ব্যানক্রফটকে নয় মাসের নির্বাসনের শাস্তি দেওয়া হয়। স্মিথের নেতৃত্ব নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। অস্ট্রেলীয় ক্রিকেটের ইতিহাসে এই ঘটনা একটি বড় কলঙ্ক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে রয়েছে।
সেই বিতর্কের পর দীর্ঘ সময় কেটে গেলেও ঘটনাটি যে ক্রিকেটপ্রেমীদের স্মৃতিতে এখনও উজ্জ্বল, সুপারস্পোর্টের প্রচার থেকেই তা স্পষ্ট। বিশেষ করে দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে অস্ট্রেলিয়ার নতুন টেস্ট সিরিজ়ের আগে এই প্রসঙ্গ তুলে আনা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন অনেকে।
ক্যামেরার নজর নিয়ে বার্তা, বাড়ছে কৌতূহল
ক্রিকেটে প্রযুক্তির ব্যবহার এখন অনেক বেড়েছে। মাঠের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা ক্যামেরার মাধ্যমে ম্যাচের প্রতিটি মুহূর্ত সম্প্রচার করা হয়। ফলে ক্রিকেটারদের আচরণ থেকে শুরু করে বলের সঙ্গে তাঁদের কোনও অস্বাভাবিক কার্যকলাপ, সবই ক্যামেরায় ধরা পড়ার সম্ভাবনা থাকে। সুপারস্পোর্টের ‘ক্যামেরার নজর তীক্ষ্ণ’ মন্তব্যকে সেই প্রেক্ষিতেই দেখছেন ক্রিকেটপ্রেমীদের একাংশ।
তবে সম্প্রচারকারী সংস্থার এই প্রচারমূলক বার্তার অর্থ এই নয় যে, অস্ট্রেলীয় দল কোনও অনৈতিক কাজ করতে চলেছে। বরং অতীতের বিতর্ককে কাজে লাগিয়ে সিরিজ়ের উত্তেজনা বাড়ানোর কৌশল হিসেবেও দেখা যেতে পারে বিষয়টিকে। ক্রিকেটের মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেমন থাকবে, তেমনই নিয়ম মেনে খেলার বিষয়টিও যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সেই বার্তাই যেন দিতে চেয়েছে সুপারস্পোর্ট।
এখন নজর প্রথম টেস্টের দিকে। প্যাট কামিন্সের নেতৃত্বাধীন অস্ট্রেলিয়া দল মাঠে কেমন পারফর্ম করে, তা দেখার অপেক্ষায় ক্রিকেটবিশ্ব। পাশাপাশি, আট বছর আগের সেই বিতর্ককে সামনে রেখে দক্ষিণ আফ্রিকার সম্প্রচারকারী সংস্থার এই কটাক্ষ অস্ট্রেলীয় শিবির কী ভাবে নেয়, তা নিয়েও আগ্রহ তৈরি হয়েছে। মাঠের লড়াই শুরু হওয়ার আগেই তাই পুরনো বিতর্ক ঘিরে নতুন করে উত্তাপ ছড়াল দক্ষিণ আফ্রিকা-অস্ট্রেলিয়া টেস্ট সিরিজ়ে।