কেরলের বাম সরকারের ধাঁচে ১৫ বছরের বয়সসীমা উত্তীর্ণ বাস চালানোর অনুমতি দিক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার। সম্প্রতি এমন দাবি করে পরিবহণসচিব সৌমিত্র মোহনকে চিঠি দিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ বাস-মিনিবাস সমন্বয় সমিতি। চিঠির সঙ্গে কেরল সরকারের প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিও যুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। কী ভাবে তারা ১৫ বছরের মেয়াদ উত্তীর্ণ বাসগুলিকে কম খরচে রাস্তায় নামানোর সুযোগ করে দিয়েছে সেই বিষয়টি মূলত তুলে ধরেছে ওই সংগঠন। কেন্দ্রীয় পূর্ত ও সড়ক পরিবহণ মন্ত্রক গাড়ির ‘সার্টিফিকেট অফ ফিটনেস’ (সিএফ) প্রদানের ক্ষেত্রে ফি উল্লেখযোগ্য ভাবে বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেয়। ১১ নভেম্বর এই সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি জারি করে কেন্দ্র। নতুন নিয়মে সব ধরনের যানবাহনের ক্ষেত্রেই ‘ফিটনেস সার্টিফিকেট’ নবীকরণের খরচ বেড়েছে, যার সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে পুরনো ও বাণিজ্যিক যানবাহনের উপর।
কেন্দ্রীয় বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, যানবাহনের বয়সের ভিত্তিতে ফিটনেস পরীক্ষার ফি নির্ধারণে নতুন কাঠামো চালু করা হয়। যানবাহনকে তিনটি ধাপে ভাগ করা হয়েছে— ১০ থেকে ১৫, ১৫ থেকে ২০ বছর এবং ২০ বছরের বেশি। বিশেষ করে বাণিজ্যিক যানবাহনের ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরও বাড়ানো হয়েছে। আগে যেখানে ১৫ বছর বয়সের পর থেকে উচ্চ ফি কার্যকর হত, এখন তা কমিয়ে ১০ বছর করা হয়েছে। নতুন নিয়মে ব্যক্তিগত হালকা মোটরযান, অর্থাৎ ২০ বছরের বেশি পুরনো গাড়ির ফিটনেস নবীকরণ ফি ১০,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫,০০০ টাকা করা হয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে বাণিজ্যিক যানবাহনের ক্ষেত্রে। ২০ বছরের বেশি পুরনো ভারী ট্রাক ও বাসের ফি ৩,৫০০ টাকা থেকে এক লাফে ২৫,০০০ টাকা করা হয়েছে। মাঝারি বাণিজ্যিক যানবাহনের ক্ষেত্রে ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ২০,০০০ টাকা এবং হালকা বাণিজ্যিক যানবাহনের ক্ষেত্রে ১৫,০০০ টাকা। দুই চাকার যানবাহনের ক্ষেত্রেও ফি ৬০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২,০০০ টাকা করা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় সরকারের এমন বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ পরিবহণমন্ত্রী স্নেহাশিস চক্রবর্তী ও পরিবহণসচিবকে চিঠি দিয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গ বাস মিনিবাস সমন্বয় সমিতির সাধারণ সম্পাদক রাহুল চট্টোপাধ্যায়। সেই চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, এই ফি বৃদ্ধি কার্যত পুরনো বাস চালানোকে অসম্ভব করে তুলবে, যার প্রভাব পড়বে গণপরিবহণ ব্যবস্থার উপর। শেষ পর্যন্ত ভোগান্তিতে পড়বেন সাধারণ যাত্রীরাই। করোনাকালীন লকডাউনের জেরে পরিবহণ শিল্পের কোমর ভেঙে গিয়েছে। এখনও বেসরকারি পরিবহণ সারা দেশেই মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি। সেই সময় এমন সিএফের ফি বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত মরার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতোই। তাই এই বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ দাবি করেছিলেন তাঁরা।
গত ১৭ জানুয়ারি কেরল সরকারের তরফে ১৫ বছরের মেয়াদ উত্তীর্ণ গাড়িগুলিকে রাস্তায় নামানো নিয়ে নতুন বিজ্ঞপ্তি জারি হয়। সেই বিজ্ঞপ্তিতে কেন্দ্রীয় নীতিকে সরিয়ে দিয়ে নতুন নীতির ঘোষণা করা হয়েছে। কেরল সরকার ১৫ বছরের বেশি পুরনো যানবাহনের সিএফ উল্লেখযোগ্য ভাবে কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনা করে রাজ্য সরকারের হাতে থাকা বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করে কেরল এই ফি প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দেওয়ার ঘোষণা করেছে। নির্দেশিকা অনুযায়ী, ১৫ থেকে ২০ বছর বয়সি যানবাহনের ক্ষেত্রে মোটরসাইকেলের ফিটনেস ফি নির্ধারিত হয়েছে ৫০০ টাকা, অটো বা থ্রি-হুইলারের জন্য ৬০০ টাকা, হালকা যানের জন্য ১,০০০ টাকা এবং ভারী যানবাহনের ক্ষেত্রেও ১,০০০ টাকা। অন্য দিকে, ২০ বছরের বেশি পুরনো গাড়ির জন্য মোটরসাইকেলের ফি ৫০০ টাকা, অটো বা থ্রি-হুইলারের জন্য ১,০০০ টাকা, হালকা যানবাহনের জন্য ১,৩০০ টাকা এবং ভারী যানবাহনের জন্য ১,৫০০ টাকা ধার্য করা হয়েছে।
কেরল সরকারের মতে, কেন্দ্রের নির্ধারিত বাড়তি ফি সাধারণ মানুষের পক্ষে বহন করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। পরিবহনণ শ্রমিক সংগঠন ও গাড়িমালিকদের দাবি ছিল, এত বেশি ফি আদায় হলে বহু পুরনো যান রাস্তায় নামানোই সম্ভব হবে না। সেই চাপ লাঘব করতেই রাজ্য সরকার এই ছাড় দিয়েছে। ইতিমধ্যেই কেরলের মোটর যান বিভাগকে (এমভিডি) তাদের অনলাইন সফটঅয়্যার ও ফিটনেস পরীক্ষার ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন এনে নতুন ফি কাঠামো দ্রুত কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্তে কেরলের গাড়িমালিক ও পরিবহণ মহলে স্বস্তির বাতাবরণ তৈরি হয়েছে। সেই স্বস্তির পরিবেশ পশ্চিমবঙ্গের পরিবহণ ব্যবসায়ীদের মধ্যে জরুরি বলেই মনে করছে বাস-মিনিবাস সমন্বয় সমিতির কর্তারা।