ঢাকা: পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সংঘাতের সময় চিনা J-10CE যুদ্ধবিমান নিয়ে নানা দাবি ও প্রচার সামনে এসেছিল। সেই আবহের পরেই এবার চিনের কাছ থেকে J-10CE যুদ্ধবিমান কেনার দিকে আরও এক ধাপ এগোল বাংলাদেশ। ফলে প্রশ্ন উঠছে, পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা কি ঢাকার সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে? নাকি এটি বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি সামরিক আধুনিকীকরণ পরিকল্পনারই অংশ?
সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, চিনের কাছ থেকে ২০টি J-10CE যুদ্ধবিমান কেনার জন্য বাংলাদেশ একটি খসড়া চুক্তি তৈরির প্রক্রিয়ায় এগিয়েছে। সম্ভাব্য চুক্তির মূল্য প্রায় ২৩০ কোটি ডলার বলে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে চূড়ান্ত চুক্তি এখনও স্বাক্ষরিত হয়নি এবং সংখ্যা, দাম ও সরবরাহের সময়সূচি নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা বাকি রয়েছে।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান জানিয়েছেন, J-10CE-এর দিকে ঢাকার আগ্রহের অন্যতম কারণ পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের ২০২৫ সালের সংঘাতের সময় বিমানটির কথিত কার্যকারিতা। বিশেষ করে ভারতীয় রাফালের বিরুদ্ধে J-10CE-এর সাফল্য নিয়ে যে দাবি ছড়িয়েছিল, তা বাংলাদেশের মূল্যায়নে প্রভাব ফেলেছে বলে তাঁর বক্তব্য থেকে ইঙ্গিত মিলেছে।
তবে এখানেই রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। পাকিস্তানের প্রচারিত যুদ্ধ-সাফল্যের সব দাবি স্বাধীন ভাবে যাচাই করা হয়নি। ফলে শুধুমাত্র সেই দাবির ভিত্তিতে বাংলাদেশের মতো একটি দেশের বড় প্রতিরক্ষা সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে—এমন সরল সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক হবে না। J-10CE কেনার পরিকল্পনা নিয়ে ঢাকার আলোচনা আসলে বেশ কিছুদিন ধরেই চলছিল।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে পুরনো যুদ্ধবিমানগুলির পরিবর্তে আধুনিক বহু-ভূমিকা সম্পন্ন বিমান সংগ্রহের পরিকল্পনা করছে। চিনের পাশাপাশি ইউরোপীয় যুদ্ধবিমান নিয়েও ঢাকার আগ্রহ ছিল। ফলে J-10CE বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে দাম, সরবরাহ, রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশিক্ষণ এবং চিনের সঙ্গে দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে।
চিন ইতিমধ্যেই বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী। নৌবাহিনীর সরঞ্জাম থেকে শুরু করে সাঁজোয়া যান, ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা এবং যুদ্ধবিমান—বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা রয়েছে। নতুন চুক্তি হলে সেই নির্ভরতা আরও বাড়তে পারে।
এখানেই ভারতের কৌশলগত উদ্বেগের জায়গা। বাংলাদেশ যদি চিনা যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার এবং অন্যান্য প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের উপর নির্ভরতা বাড়ায়, তা হলে দক্ষিণ এশিয়ার সামরিক ভারসাম্যে তার প্রভাব পড়তে পারে। একই সময়ে ঢাকা যদি পাকিস্তান, তুরস্ক ও চিনের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক আরও গভীর করে, তা হলে ভারতের পূর্ব সীমান্ত ঘিরে নতুন কূটনৈতিক সমীকরণ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
তবে এখনই বাংলাদেশকে ‘চিনের ফাঁসে’ পড়েছে বলে চূড়ান্ত মন্তব্য করার সময় আসেনি। প্রতিরক্ষা ক্রয়ের পাশাপাশি ঢাকা এখনও বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখছে এবং J-10CE চুক্তিও এখনও চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছয়নি।
সব মিলিয়ে, পাকিস্তানের J-10CE ব্যবহারের প্রচার বাংলাদেশের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে থাকলেও, ঢাকার পদক্ষেপকে শুধু ‘পাকিস্তানের সিঁদুর-গুজবে কান দেওয়া’ হিসেবে দেখলে ছবির পুরোটা ধরা পড়বে না। বরং এটি বাংলাদেশের বিমানবাহিনী আধুনিকীকরণ, চিনের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং দক্ষিণ এশিয়ার বদলে যাওয়া কৌশলগত সমীকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।