বিভেদ কই! বোঝাতে গুচ্ছ ব্যাখ্যা কমিশনের, বিরোধীদের চাপের মুখে নতুন পদক্ষেপও


বিতর্কটা তৈরি হয়েছিল ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন (সার) সমেত বিভিন্ন ইস্যুতে দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের সঙ্গে বাকি দুই নির্বাচন কমিশনার (ইসি) সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশীর মতানৈক্যকে ঘিরে। সর্বভারতীয় সংবাদপত্র ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’–এ প্রকাশিত এই সংক্রান্ত প্রতিবেদন ঘিরে তোলপাড় চলছে দেশজুড়ে।

জ্ঞানেশের ইস্তফা, এমনকী গ্রেপ্তারির দাবিও তুলেছে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি। এই আবহে জ্ঞানেশের সঙ্গে অন্য দুই ইসি–র ছবি সমেত একটি বিবৃতি জারি করল দেশের নির্বাচন কমিশন (ইসিআই)। তাৎপর্যপূর্ণ হলো— যে বিষয়গুলি নিয়ে দুই কমিশনার ডিসেন্ট নোট দিয়েছিলেন বলে দাবি করা হয়েছিল, তার কয়েকটি নিয়ে গত বুধবারই একটি বিবৃতি জারি করেছিল কমিশন। তবে এ দিন তিন কমিশনারের ছবি–সহ বিবৃতি বেনজির বলেই মনে করছেন অনেকে। সেই বিবৃতিতে আবার বলা হয়েছে— জ্ঞানেশ–সহ তিন জন কমিশনার শনিবার দিল্লির নির্বাচন সদনে বৈঠক করে এই প্রেস নোট ইস্যু করেছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকেরই বক্তব্য, কমিশনের তিন কর্তার মধ্যে কোনও মতানৈক্য নেই বোঝাতেই এ দিন বিবৃতির সঙ্গে তিন জনের বৈঠকের ছবিও দেওয়া হয়েছে প্রেস নোটে। ‘সার’ প্রক্রিয়া নিয়ে অস্বচ্ছতার অভিযোগ উঠেছিল গত বছর বিহারে তা শুরু হওয়ার পরপরই। যে অভিযোগ তীব্রতর হয় পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের আগে। বহু ভোটারের নাম ইচ্ছাকৃত ভাবে ভোটার লিস্ট থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। এই মুহূর্তে রাজধানী দিল্লিতে যে ‘সার’ প্রক্রিয়া চলছে, সেখানেও একই অভিযোগ উঠেছে। এই আবহে শনিবার কমিশনের তিন কর্তার বৈঠকে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা দেশজুড়ে প্রতিবাদের মধ্যে খানিকটা প্রলেপ দেওয়ার চেষ্টা বলেও মনে করছেন অনেকে।

এই বিবৃতিতে বলা হয়েছে, যে সব রাজ্যে এখন ‘সার’ চলছে এবং সেখানে ‘আনম্যাপড’ ও ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ বা যুক্তিগ্রাহ্য অসঙ্গতির অভিযোগে যাঁদের নোটিস পাঠানো হয়েছে, তাঁদের আর হিয়ারিংয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসারের (ইআরও) কাছে হাজিরা দিতে হবে না। এ সব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বুথ লেভেল অফিসাররা (বিএলও) ভোটারদের নথি নিয়ে তা আপলোড করবেন কমিশনের ‘ইসিআইনেট’ পোর্টালে। যদি একান্তই কারও শুনানির দরকার হয়, তা হলে তা যতদূর সম্ভব অনলাইনেই করা হবে।

প্রসঙ্গত, বাংলায় ‘সার’ চলাকালীন এই শুনানি ঘিরে বিস্তর অশান্তি হয়েছে। প্রচণ্ড রোদ বা বৃষ্টির মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন, কয়েকজনের মৃত্যুও হয়েছিল। যদিও সেই সময়ে অনলাইন শুনানির দাবি উঠলেও সেটা করা হয়নি। বরং কমিশন ফিজ়িক্যাল হিয়ারিংয়েই জোর দিয়েছিল। ফলে এখন যে সব রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ‘সার’ চলছে, সেখানে নতুন পদ্ধতি চালু করতে বাধ্য হলো কমিশন। একই ভাবে গরিব, ফুটপাথবাসী, দিনমজুরদের নাম তুলতে সাহায্যের জন্য হেল্প ডেস্ক খোলার কথাও বলা হয়েছে বিবৃতিতে।

সিইসি জ্ঞানেশের যে সব সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তার মধ্যে রয়েছে— ‘ইসিআইনেট’ পোর্টালের কেন্দ্রীকরণ ও স্বচ্ছতা, ভোটার তালিকায় নাম তোলার জন্য ফর্ম–৬ নিয়ে ধোঁয়াশা এবং ‘সার’–এ নাম তোলার জন্য প্রয়োজনীয় সময় না–দেওয়া। এ দিন কমিশনের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, নিচুতলার নির্বাচন কর্মী–আধিকারিকরা তাঁদের এক্তিয়ার মতো কাজটুকুই পোর্টালে করতে পারবেন। তবে এই পোর্টাল সমস্ত নিয়ম ও বিধি মেনে চলছে কি না, তা দেখার জন্য এক জন সিনিয়র ডেপুটি কমিশনার ও আইআইআইটি বা ট্রিপলআইটি–র বিশেষজ্ঞদের নিয়ে কমিটি গড়ে তার খুঁটিনাটি পরীক্ষা করা হবে। দিল্লি ও মহারাষ্ট্রে এই মুহূর্তে ‘সার’ প্রক্রিয়া চলছে। দু’টি রাজ্যেই ‘সার’–এর সময়সীমা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন।

দুই কমিশনারের ডিসেন্ট নোটের মধ্যে অন্যতম ছিল— গত বছর খানেকের মধ্যে কমিশনের মিটিংয়ের অ্যাজেন্ডা ও মিনিটস না–মেলা, কমিশনের আধিকারিকদের একাংশের প্রয়োজনীয় অনুমতি না–নিয়ে বিদেশ সফর ইত্যাদি। এ দিন জ্ঞানেশ–সহ তিন কমিশনারের বৈঠকের পরে সিদ্ধান্ত হয়েছে যে, কমিশনের সব বৈঠকের অ্যাজেন্ডা ও মিনিটস দেওয়া হবে। কোনও আধিকারিক বিদেশ সফর করতে গেলে প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিতে হবে।

পশ্চিমবঙ্গ–সহ দেশের ২০টি রাজ্যের ‘সার’ প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে শেষ হয়ে গিয়েছে। বাংলায় ‘সার’ চলাকালীন ‘এএসডিডি’ বা (মৃত, অনুপস্থিত, স্থানান্তরিত, ডুপ্লিকেট) এবং ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ পর্ব মিলিয়ে মোট প্রায় ৬৩ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়েছি‍ল। আর সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে বিচারবিভাগীয় অফিসারদের ‘অ্যাজুডিকেশন’ প্রক্রিয়ায় বাদ গিয়েছিল আরও প্রায় ২৭ লক্ষ নাম। এঁদের মধ্যে প্রায় ২২ লক্ষ ভোটার নিজেদের নাম তোলার জন্য অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনালের দ্বারস্থ হয়েছেন। আবার বর্তমান ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১৬ লক্ষ নাম বাদ দেওয়ার জন্য কমিশন আর্জি জানিয়েছে ট্রাইব্যুনালে। অর্থাৎ ট্রাইব্যুনালেই ঝুলে রয়েছে প্রায় ৩৮ লক্ষ আবেদন। ক’দিন আগে সুপ্রিম কোর্টে কমিশন জানিয়েছে, যে ভাবে শুনানি চলছে, তাতে এত আবেদনের নিষ্পত্তি করতে গেলে অন্তত ১২ বছর লেগে যাবে।

Post a Comment

Previous Post Next Post