তেলের বিপুল ভান্ডার রয়েছে। অথচ সেই ইরানেই এখন পেট্রল নিয়ে হাহাকার! আমেরিকার সঙ্গে দীর্ঘ সংঘাত, নিষেধাজ্ঞা, জ্বালানি আমদানির পথে বাধা এবং দেশের পরিশোধন ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা— সব মিলিয়ে ভয়াবহ জ্বালানি সঙ্কটের মুখে তেহরান। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, ইরানের কাছে আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ থেকে দু’মাসের মতো পেট্রল মজুত রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রের দাবি।
ইরানের জ্বালানি সঙ্কটের মূল কারণ অবশ্য অপরিশোধিত তেলের অভাব নয়। দেশটির সমস্যা মূলত পরিশোধন ক্ষমতা এবং সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে। অর্থাৎ মাটির নীচে তেল থাকলেও সেটিকে প্রয়োজনীয় পরিমাণে পেট্রলে পরিণত করে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। যুদ্ধ এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে বিদেশ থেকে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানিও বাধার মুখে পড়েছে।
উৎপাদনের তুলনায় চাহিদা বেশি
ইরানে প্রতিদিন প্রায় ১২ কোটি লিটার পেট্রল উৎপাদন হলেও দৈনিক চাহিদা প্রায় ১৩.৫ কোটি লিটার। ফলে প্রতিদিন প্রায় দেড় কোটি লিটারের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। আগে আমদানির মাধ্যমে সেই ঘাটতির একটা বড় অংশ পূরণ করা হত। কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সেই সরবরাহ ব্যবস্থাও ধাক্কা খেয়েছে।
ফলে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পেট্রল পাম্পের সামনে দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে। জ্বালানি বণ্টনে কড়াকড়ি বাড়ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ইতিমধ্যেই অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যবহারকারীদের জন্য পেট্রলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইরান সরকার। মাসে ১১০ লিটারের বেশি পেট্রল ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে তৃতীয় স্তরের দাম বাড়িয়ে প্রতি লিটার ১ লক্ষ রিয়াল করা হয়েছে।
‘তেলের দেশ’ হয়েও কেন এই দশা?
ইরানের হাতে অপরিশোধিত তেলের বিশাল মজুত থাকলেও অপরিশোধিত তেল আর পেট্রল এক জিনিস নয়। গাড়িতে ব্যবহারের উপযোগী পেট্রল পেতে প্রয়োজন আধুনিক ও পর্যাপ্ত রিফাইনারি। যুদ্ধের অভিঘাত, নিষেধাজ্ঞা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার সমস্যায় সেই জায়গাতেই তৈরি হয়েছে বড় ফাঁক।
তার উপর ইরানের জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা, বিমা এবং সমুদ্রপথ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নানা বাধা রয়েছে। ফলে প্রয়োজন থাকলেও দ্রুত বিদেশ থেকে জ্বালানি আনা কঠিন হয়ে পড়ছে।
লাভের গুড় কি ভারতের?
এই পরিস্থিতিতে ভারতের দিকে বিশেষ নজর রয়েছে। কারণ ভারত বিশ্বের অন্যতম বড় তেল আমদানিকারক এবং একই সঙ্গে বড় রিফাইনারি শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে। যুদ্ধের জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহে চাপ বাড়ায় ভারত ইতিমধ্যেই বিকল্প উৎস থেকে অপরিশোধিত তেল সংগ্রহ এবং দেশীয় পরিশোধন ক্ষমতা কাজে লাগানোর দিকে জোর দিয়েছে।
ফলে ইরানের মতো দেশে পরিশোধিত জ্বালানির ঘাটতি তৈরি হলে ভারতীয় রিফাইনারিগুলির জন্য রফতানির সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে এশিয়ার বাজারে পেট্রল-ডিজেলের চাহিদা বাড়লে ভারতীয় সংস্থাগুলি অতিরিক্ত উৎপাদন ও রফতানি থেকে লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে ছবির অন্য দিকও রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়লে ভারতকেও বেশি দামে তেল কিনতে হবে। ইতিমধ্যেই ইরান যুদ্ধের অভিঘাতে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপিছু ১০০ ডলারের উপরে উঠেছে। বিশ্ব বাজারে সরবরাহ আরও কমলে সেই চাপ ভারতের আমদানি বিল, পরিবহণ খরচ এবং সামগ্রিক মূল্যবৃদ্ধির উপর পড়তে পারে।
দিল্লির সামনে তাই দ্বিমুখী সমীকরণ
ইরানের জ্বালানি সঙ্কট ভারতের জন্য একদিকে ব্যবসার সুযোগ তৈরি করতে পারে, অন্যদিকে তৈরি করতে পারে বড় ঝুঁকি। পরিশোধিত জ্বালানি রফতানি করে ভারতীয় সংস্থাগুলি লাভবান হতে পারে ঠিকই, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের জেরে বিশ্ব বাজারে অপরিশোধিত তেলের জোগান কমে গেলে সেই লাভের একটা বড় অংশই বাড়তি আমদানি খরচে চলে যেতে পারে।
তার উপর হরমুজ প্রণালী ঘিরে অস্থিরতা ভারতের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে ভারতের বিপুল পরিমাণ জ্বালানি আমদানি এই সামুদ্রিক পথের সঙ্গে যুক্ত। আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থাও ২০২৬ সালে যুদ্ধ ও উপসাগরীয় সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার কারণে বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহের ঘাটতি আরও বাড়ার আশঙ্কা জানিয়েছে।
অর্থাৎ ইরানের পাশে দাঁড়ানো শুধু কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, ভারতের কাছে এটি বড় অর্থনৈতিক সমীকরণও। তেহরানের জ্বালানি সঙ্কট যদি দীর্ঘায়িত হয়, তবে ভারতীয় রিফাইনারিগুলির সামনে নতুন বাজারের দরজা খুলতে পারে। কিন্তু যুদ্ধ যদি গোটা উপসাগরীয় তেল সরবরাহ ব্যবস্থাকেই আরও বিপর্যস্ত করে, তা হলে সেই ‘লাভের গুড়’-এর সঙ্গে জুড়ে যেতে পারে আমদানি খরচ এবং মূল্যবৃদ্ধির তেতো স্বাদও।