নন্দীগ্রাম বিধানসভা উপনির্বাচনের আগে নতুন করে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হল। নির্বাচনে লড়াই করার জন্য কলকাতা হাই কোর্ট থেকে অন্তর্বর্তী জামিন পাওয়ার পর জেল থেকে মুক্তি পেয়েই বিস্ফোরক অভিযোগ করলেন নন্দীগ্রামের কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধান। তাঁর দাবি, প্রার্থিপদ প্রত্যাহার করে নেওয়ার জন্য তাঁকে চাপ দেওয়া হয়েছিল। এমনকি, প্রার্থিপদ থেকে সরে দাঁড়ালে তাঁর ‘যা প্রয়োজন’, তা পাইয়ে দেওয়ার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল। মিলনের অভিযোগ, সেই প্রস্তাব এসেছিল পুলিশের তরফেই।
মঙ্গলবার কলকাতা হাই কোর্ট নন্দীগ্রামের কংগ্রেস প্রার্থীকে ছ’টি মামলায় অন্তর্বর্তী জামিন দেয়। ভোটের প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে জেলের বাইরে থাকার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, নির্দিষ্ট সময়ের পরে তাঁকে ফের আত্মসমর্পণ করতে হবে।
বুধবার জেল থেকে বেরিয়ে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হন মিলন। সেখানেই তিনি পুলিশের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর অভিযোগ তোলেন। তাঁর দাবি, তাঁকে গ্রেফতার করার আগে এবং পরে একাধিক ভাবে চাপ তৈরি করা হয়েছিল। এমনকি নির্বাচনী লড়াই থেকে সরে দাঁড়ানোর বিনিময়ে সুবিধা দেওয়ার কথাও বলা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি।
মিলনের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁকে বলা হয়েছিল, প্রার্থিপদ প্রত্যাহার করে নিলে তিনি যা চান, তা-ই পেয়ে যাবেন। তাঁর দাবি, শুধু রাজনৈতিক ভাবে লড়াই থেকে সরিয়ে দেওয়াই নয়, তাঁকে ‘অপহরণ’ করার মতো পরিস্থিতিও তৈরি করা হয়েছিল। তবে তাঁর এই সমস্ত অভিযোগের স্বাধীন ভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনে কংগ্রেসের প্রার্থী হিসাবে মিলন প্রধানের নাম ঘোষণার পর থেকেই তাঁকে ঘিরে আইনি জট তৈরি হয়। ২০০৭ সালের পুরনো মামলাগুলিতে তাঁর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করে পুলিশ। খুন, খুনের চেষ্টা, বেআইনি জমায়েত এবং লুটপাট-সহ একাধিক অভিযোগে মামলা ছিল বলে আদালতে বিষয়টি উঠে এসেছে। প্রায় ১৯ বছর আগের মামলায় গ্রেফতারির সময় নিয়েও রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন ওঠে।
এরই মধ্যে নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনে তৃণমূলের প্রার্থী সঞ্চিতা প্রধান দে মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নেন। এর পর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছিলেন, ওই কেন্দ্রে তৃণমূল কংগ্রেসকে সমর্থন করবে। তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মিলনকে গ্রেফতার করা হয় বলে কংগ্রেসের তরফে দাবি করা হয়েছে। দলটির অভিযোগ ছিল, নির্বাচনের আগে বিরোধী প্রার্থীকে আইনি জটিলতায় ফেলে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এই পদক্ষেপ করা হয়েছে। অন্যদিকে, পুলিশ ও রাজ্যের তরফে মামলাগুলি পুরনো এবং আইন মেনেই পদক্ষেপ করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
মিলনের গ্রেফতারির পর বিষয়টি কলকাতা হাই কোর্ট পর্যন্ত গড়ায়। প্রথমে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলায় আইনি সুরক্ষা নিয়ে টানাপড়েন চললেও শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ করে দিয়ে অন্তর্বর্তী জামিন মঞ্জুর করে হাই কোর্ট। বিচারপতি তীর্থঙ্কর ঘোষের বেঞ্চ ছ’টি মামলায় তাঁকে অন্তর্বর্তী জামিন দেয়। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, ২০ অক্টোবর পর্যন্ত তিনি জামিনে থাকবেন এবং তার পর নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় আত্মসমর্পণ করতে হবে।
তবে মিলনের জামিন নিয়েও আইনি জট পুরোপুরি কাটেনি। তাঁর অন্তর্বর্তী জামিনের নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে রাজ্য সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে। ৩০ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্টে এই আবেদন দ্রুত শুনানির আর্জি জানানো হলেও তাৎক্ষণিক শুনানি হয়নি। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ আগামী ৫ অক্টোবর মামলাটি শুনবে বলে জানিয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে জেল থেকে বেরিয়ে মিলনের নতুন অভিযোগ ঘিরে নন্দীগ্রামের উপনির্বাচনের রাজনৈতিক উত্তাপ আরও বাড়ল। তাঁর দাবি, তাঁকে ভোটের ময়দান থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য পুলিশি চাপ তৈরি করা হয়েছিল এবং এর পিছনে বিজেপির নির্দেশ ছিল। যদিও এই অভিযোগেরও স্বাধীন প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে ভোটের আগে মিলনের অভিযোগ এবং তার প্রেক্ষিতে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়েছে।