অটোরিকশা দুর্ঘটনা বদলে দিয়েছে জীবন, ভাঙা উরু নিয়ে এক মাস হাসপাতালে কাটানো কমলজিৎ এশিয়াডে সোনা দিলেন দেশকে


তিন বছর আগে ভয়াবহ অটো দুর্ঘটনায় গুরুতর জখম হয়েছিলেন। ভাঙা উরুর হাড় নিয়ে এক মাস হাসপাতালে কাটাতে হয়েছিল তাঁকে। একটা সময় প্রশ্ন উঠেছিল, আদৌ কি আর কোনও দিন স্বাভাবিক ভাবে দাঁড়াতে পারবেন? সেই কমলজিৎই শুক্রবার এশিয়ান গেমসের মঞ্চে দেশকে এনে দিলেন সোনা।
এক সময় যে দুর্ঘটনা তাঁর কেরিয়ার থামিয়ে দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছিল, সেই দুর্ঘটনাই যেন জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল কমলজিৎ-এর। অ্যাথলেটিক্স ছেড়ে হাতে তুলে নিয়েছিলেন শুটিংয়ের পিস্তল। আর সেই খেলাতেই এখন দেশের হয়ে সাফল্যের নতুন অধ্যায় লিখলেন ২৩ বছরের তরুণ।
দুর্ঘটনায় থমকে গিয়েছিল জীবন
অনুশীলন শেষে গ্রামের বাড়িতে ফিরছিলেন কমলজিৎ। অটোতে করে ফেরার পথেই ঘটে ভয়াবহ দুর্ঘটনা। দুর্ঘটনায় তাঁর সঙ্গে থাকা দুই সহযাত্রীর মৃত্যু হয়। গুরুতর আহত হন কমলজিৎও।
ভেঙে যায় উরুর ফিমার হাড়। শরীরের আরও একাধিক জায়গায় গুরুতর চোট লাগে। তাঁকে ভর্তি করা হয় গুরগাঁওয়ের একটি বেসরকারি হাসপাতালে। প্রায় এক মাস হাসপাতালেই কাটাতে হয় তরুণকে।
কমলজিতের পরিবার আর্থিক ভাবে স্বচ্ছল নয়। যৌথ পরিবারে রয়েছে প্রায় দু’একর কৃষিজমি। তাঁর বাবা রতিরাম স্থানীয় একটি রঙের কারখানায় চুক্তিভিত্তিক শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। ছেলের চিকিৎসার জন্য আত্মীয়স্বজন এবং বন্ধুদের কাছ থেকে টাকা ধার করতে হয়েছিল তাঁকে। চিকিৎসায় খরচ হয়েছিল প্রায় চার লক্ষ টাকা।
সেই কঠিন সময় পেরিয়ে শুক্রবার ছেলের হাতে এশিয়ান গেমসের সোনা দেখে আবেগে আপ্লুত বাবা রতিরাম।
তিনি বলেন, “কমলজিতের উরু খুব খারাপ ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। দীর্ঘ দিন যন্ত্রণা হত। ওর চিকিৎসার জন্য চার লাখ টাকা খরচ হয়েছিল। আত্মীয়-বন্ধুদের থেকে ধার নিয়ে চিকিৎসা করিয়েছিলাম। ওই দুর্ঘটনার কথা মনে পড়লে এখনও ভয় লাগে। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, সেই অবস্থা থেকে ফিরিয়ে এনে ওকে এশিয়ান গেমসে সোনাও জেতালেন।”
যে ইভেন্টে নামার কথাই ছিল না, সেখানেই সোনা
শুক্রবার ১০ মিটার এয়ার পিস্তলের মিক্সড টিম ইভেন্টে হরিয়ানারই শুটার সুরুচি সিংহের সঙ্গে জুটি বাঁধেন কমলজিৎ। ভারতীয় দলের হয়ে সোনা জিতে দেশের মুখ উজ্জ্বল করেন তাঁরা।
তবে মজার বিষয় হল, এই ইভেন্টে কমলজিতের নামার কথাই ছিল না। সতীর্থ শুটার ফর্মে না থাকায় শেষ মুহূর্তে সুরুচির সঙ্গে জুটি হিসেবে কমলজিৎকে নামানোর সিদ্ধান্ত নেয় ভারতীয় শুটিং কর্তৃপক্ষ।
শেষ মুহূর্তে পাওয়া সেই সুযোগের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করেন তরুণ শুটার। আস্থার মর্যাদা রেখে দেশের ঝুলিতে তুলে দেন সোনা।
সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার স্বপ্ন ছিল
ছোট থেকেই শুটিং নয়, অ্যাথলেটিক্স ছিল কমলজিতের পছন্দ। শারীরিক সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য ছোটবেলা থেকেই দৌড়ঝাঁপ করতেন তিনি। তাঁর স্বপ্ন ছিল ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া।
কিন্তু দুর্ঘটনার পর দৌড়ের কেরিয়ারে ইতি টানতে হয়। এরপর শখের শুটিংকেই পাকাপাকি ভাবে নিজের খেলা হিসেবে বেছে নেন কমলজিৎ। সেই সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত তাঁকে নিয়ে যায় এশিয়ান গেমসের সোনার মঞ্চে।
খেলোয়াড় কোটায় বর্তমানে ভারতীয় সেনায় হাবিলদার পদে কর্মরত তিনি।
১৫ বছর বয়সে শুটিংয়ের সঙ্গে পরিচয়
২০১৯ সালে কাকা দীনেশ সোহলটের সঙ্গে একটি শুটিং অ্যাকাডেমিতে প্রথম যান কমলজিৎ। অ্যাকাডেমিটি চালাতেন দীনেশের বন্ধু শক্তিপাল।
তখন কমলজিতের বয়স মাত্র ১৫ বছর। শুটিং তাঁর ভালো লাগলেও অ্যাথলেটিক্স তখনও ছাড়েননি। ধীরে ধীরে পিস্তল হাতে তাঁর দক্ষতা নজর কাড়তে শুরু করে।
কিন্তু শুটিং এমন একটি খেলা, যার সরঞ্জাম এবং প্রশিক্ষণের খরচ বহন করা পরিবারের পক্ষে কঠিন ছিল। কমলজিতের পাশে দাঁড়ান প্রশিক্ষক শক্তিপাল। তাঁর প্রশিক্ষণের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন তিনি। কাকা দীনেশও ভাইপোর জন্য টাকা ধার করেছিলেন।
দীনেশ বলেন, “আমাদের যৌথ পরিবার। দু’একর জমিও আছে। তাতে বড় যৌথ পরিবারের খরচ চলে না। কমলজিৎ ছোট থেকে স্বপ্ন দেখত সেনাবাহিনীতে যোগ দেবে। পরিবারের দায়িত্ব নেবে। আমার বন্ধু শক্তিপাল ওর সহনশীলতায় মুগ্ধ হয়। শক্তিপালই শুটিং শুরু করার পরামর্শ দিয়েছিল কমলজিৎকে। কিন্তু এত খরচ চালানো আমাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। সেই সমস্যাও শক্তিপাল সমাধান করে দেয়।”
প্রতিভা চিনেছিলেন প্রশিক্ষক
কমলজিতের প্রতিভা প্রথম থেকেই বুঝতে পেরেছিলেন শক্তিপাল। পরিবারের আর্থিক পরিস্থিতির কথা জানতেন তিনি। তাই পিস্তল কেনা থেকে প্রশিক্ষণ—সব ক্ষেত্রেই পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।
শক্তিপালের কথায়, “কমলজিৎ যখন প্রথম শুটিং শিখতে আসে, তখন ওর পরিবারের পক্ষে পিস্তল কেনা সম্ভব ছিল না। ওদের আর্থিক অবস্থার কথা আমি জানতাম। ওর শরীরের গঠন শুটিংয়ের জন্য দুর্দান্ত। তাই আমিই দায়িত্ব নিয়ে শেখাতে শুরু করি।”
প্রথম দিকে শুধুই শখের বশে প্রশিক্ষণ চললেও খুব দ্রুত উন্নতি করতে শুরু করেন কমলজিৎ। তাঁর চোখের দৃষ্টি, শারীরিক গঠন, ধৈর্য এবং ঠান্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা প্রশিক্ষকের নজর কাড়ে।
শক্তিপাল আরও বলেন, “কমলজিৎ দ্রুত উন্নতি করতে শুরু করে। ওর দৃষ্টি দারুণ। পিস্তলটাও দ্রুত রপ্ত করে ফেলে। প্রাকৃতিক ভাবে ওর কনুইয়ের গঠন এবং অবস্থান শুটিংয়ের জন্য দুর্দান্ত। মাথা ঠান্ডা। প্রচুর ধৈর্য্য।”
জুনিয়র বিশ্বকাপেও নজর কেড়েছিলেন
২০২১ সাল থেকে বিভিন্ন স্তরের প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে শুরু করেন কমলজিৎ। ধীরে ধীরে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে নিজের পরিচিতি তৈরি করেন। ২০২৩ সালে জুনিয়র বিশ্বকাপেও পদক জেতেন তিনি।
ব্যক্তিগত ইভেন্টে সব সময় প্রত্যাশামতো ফল না এলেও তাঁর প্রতিভা নিয়ে সন্দেহ ছিল না প্রশিক্ষকদের। কঠোর অনুশীলন এবং ধৈর্যের জোরে নিজেকে আরও পরিণত করে তুলেছেন তিনি।
একদিন যে তরুণকে নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল, তিনি আর কখনও দাঁড়াতে পারবেন কি না, সেই তরুণই আজ দেশের হয়ে এশিয়ান গেমসের সোনা জয় করেছেন।
অটো দুর্ঘটনার সেই ভয়াবহ স্মৃতি পেরিয়ে কমলজিতের হাতে এখন এশিয়াডের সোনার পদক। তাঁর এই যাত্রা শুধু একটি ক্রীড়া সাফল্যের গল্প নয়—প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করারও এক অনুপ্রেরণার কাহিনি।

Post a Comment

Previous Post Next Post