নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনের আগে ফের আইনি জটিলতা বাড়ল কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানের। কলকাতা হাই কোর্টের দেওয়া অন্তর্বর্তী জামিনের নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে এ বার সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। বুধবার রাজ্যের আবেদন শীর্ষ আদালতে গৃহীত হয়েছে। তবে বৃহস্পতিবারই দ্রুত শুনানির আর্জি খারিজ করে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত জানিয়েছেন, আগামী সোমবার এই মামলার শুনানি হবে।
মঙ্গলবার কলকাতা হাই কোর্টের বিচারপতি তীর্থঙ্কর ঘোষ মিলনকে ছ’টি মামলাতেই অন্তর্বর্তী জামিন দিয়েছিলেন। আদালত জানিয়েছিল, শুধুমাত্র নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার জন্যই এই অন্তর্বর্তী জামিন। তিন সপ্তাহের জন্য জামিন মঞ্জুর করা হয়েছিল। তবে একাধিক শর্তও আরোপ করেছিল আদালত। সেই নির্দেশকেই চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে গেল রাজ্য।
বুধবার সকালে হাই কোর্টের নির্দেশের বিরুদ্ধে শীর্ষ আদালতে আবেদন করে রাজ্য। পরে রাজ্যের হয়ে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা মামলাটি দ্রুত শুনানির আবেদন জানান। তাঁর বক্তব্য, মিলন একটি খুনের মামলায় অভিযুক্ত। শুধুমাত্র নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য তাঁকে জামিন দেওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা কেন দেওয়া হবে, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি। নির্বাচনের কারণে কোনও অভিযুক্তকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া যায় কি না, সে বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের পূর্ববর্তী নির্দেশের কথাও উল্লেখ করেন সলিসিটর জেনারেল।
তবে বৃহস্পতিবারই মামলাটি শুনতে রাজি হয়নি শীর্ষ আদালত। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত জানান, ইতিমধ্যেই একাধিক মামলা তালিকাভুক্ত রয়েছে। তাই তড়িঘড়ি এই মামলার শুনানি সম্ভব নয়। আগামী সোমবার মামলাটি শুনবে আদালত।
রাজ্য যে হাই কোর্টের অন্তর্বর্তী জামিনের নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে, সেই সম্ভাবনা আগেই আঁচ করেছিল কংগ্রেস শিবির। সেই কারণে বুধবারই সুপ্রিম কোর্টে ক্যাভিয়েট দায়ের করেন মিলন। জানা গিয়েছে, চারটি মামলায় ক্যাভিয়েট দাখিল করেছেন তিনি। ফলে রাজ্যের আবেদনের ভিত্তিতে শুধুমাত্র সরকারের বক্তব্য শুনে কোনও নির্দেশ দিতে পারবে না শীর্ষ আদালত। মিলন তথা কংগ্রেসের বক্তব্যও শুনতে হবে আদালতকে।
কী শর্তে জামিন মিলনের?
মঙ্গলবার অন্তর্বর্তী জামিন দেওয়ার সময় একাধিক শর্ত বেঁধে দিয়েছিল কলকাতা হাই কোর্ট। বিচারপতি তীর্থঙ্কর ঘোষ স্পষ্ট করে দেন, নির্বাচনী প্রক্রিয়া শেষ হয়ে গেলে মিলনকে হলদিয়া আদালতে আত্মসমর্পণ করতে হবে। পাশাপাশি, প্রতিদিন সকাল সাড়ে ৮টা এবং সন্ধ্যা সাড়ে ৯টায় সংশ্লিষ্ট থানায় ফোন করে তদন্তকারী আধিকারিকের সঙ্গে কথা বলার নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল তাঁকে।
এর আগে মামলার শুনানিতে বিচারপতি ঘোষ জানিয়েছিলেন, মিলনকে নির্বাচনে লড়াই করার সুযোগ দেওয়ার জন্যই অন্তর্বর্তী জামিন দেওয়া হচ্ছে। আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল, তিনি নির্বাচনে অংশ নিন, পরবর্তী বিষয়গুলি সংশ্লিষ্ট মামলার গতিপ্রকৃতির উপর নির্ভর করবে।
কী অভিযোগ রয়েছে মিলনের বিরুদ্ধে?
পুলিশ সূত্রে খবর, ২০০৭ সালের নন্দীগ্রাম জমি অধিগ্রহণ বিরোধী আন্দোলনের সময়কার একাধিক ঘটনায় মিলনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল। নন্দীগ্রাম থানায় তিনটি এবং খেজুরি থানায় একটি মামলা-সহ একাধিক মামলায় খুন, খুনের চেষ্টা, বেআইনি ভাবে জমায়েত, লুটপাটের মতো অভিযোগ রয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে দাবি।
গত ১৯ সেপ্টেম্বর পূর্ব মেদিনীপুরের চণ্ডীপুর থেকে মিলনকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারির পর তাঁর বিরুদ্ধে আরও কয়েকটি মামলা দায়ের হয়েছিল বলে জানা যায়। সেই মামলাগুলিতে রক্ষাকবচ চেয়ে প্রথমে আদালতের দ্বারস্থ হন মিলন।
সেই সময় রাজ্যের তরফে আদালতে জানানো হয়েছিল, নতুন করে দায়ের হওয়া পাঁচটি মামলায় মিলন মূল অভিযুক্ত নন। সেই কারণে ওই পর্যায়ে হাই কোর্ট তাঁর আবেদনে হস্তক্ষেপ করেনি।
এর পরেই জামিনের আবেদন করেন মিলন। সেই মামলার শুনানির সময়ই বিচারপতি তীর্থঙ্কর ঘোষ নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনে তাঁর অংশগ্রহণের বিষয়টি বিবেচনা করেন। পরে ছ’টি মামলাতেই অন্তর্বর্তী জামিন মঞ্জুর করা হয়।
নন্দীগ্রামে আরও দুই কংগ্রেস নেতা আটক
এর মধ্যেই নন্দীগ্রামে আরও দুই কংগ্রেস নেতাকে আটক করার ঘটনা সামনে এসেছে। উপনির্বাচনের আগে মিলন প্রধানকে ঘিরে আইনি টানাপড়েনের মধ্যেই দলের আরও দুই নেতাকে পুলিশ আটক করায় রাজনৈতিক উত্তাপও বাড়ছে। তাঁদের কী কারণে আটক করা হয়েছে, সেই বিষয়টি নিয়েও কংগ্রেসের তরফে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
ফলে এক দিকে মিলনের অন্তর্বর্তী জামিন নিয়ে রাজ্য বনাম কংগ্রেসের আইনি লড়াই পৌঁছে গিয়েছে সুপ্রিম কোর্টে, অন্য দিকে মাটিতে নির্বাচনী প্রচারের মধ্যেও একের পর এক ঘটনা সামনে আসছে। আগামী সোমবার শীর্ষ আদালতে শুনানির পর মিলনের অন্তর্বর্তী জামিন বহাল থাকে, নাকি হাই কোর্টের নির্দেশে কোনও পরিবর্তন হয়, এখন সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের।