কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকায় ৫ হাজার পুকুর বুজিয়েছে তৃণমূল! পুরসভার অনুষ্ঠানে অভিযোগ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর


কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকায় ৫ হাজার পুকুর বুজিয়েছে তৃণমূল! পুরসভার অনুষ্ঠানে বিস্ফোরক অভিযোগ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর

কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকায় গত সরকারের আমলে প্রায় পাঁচ হাজার পুকুর বুজিয়ে দেওয়া হয়েছে! সোমবার টালিগঞ্জ বিধানসভা এলাকায় কলকাতা পুরসভার একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে এমনই বিস্ফোরক অভিযোগ করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর অভিযোগের তির সরাসরি পূর্বতন তৃণমূল সরকারের দিকে। পুকুর বোজানো থেকে শুরু করে কলকাতার পরিবেশ ধ্বংস—একাধিক বিষয়ে প্রাক্তন সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। একই সঙ্গে কলকাতা পুরসভার আসন্ন নির্বাচনের আগে নিজের সরকারের উন্নয়নমূলক কাজের খতিয়ানও তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী।

নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে কলকাতা পুরসভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। তার আগে শহরের পরিকাঠামো উন্নয়ন, জলাশয় সংরক্ষণ এবং পরিবেশ রক্ষার মতো বিষয়গুলিকে সামনে রেখে রাজনৈতিক তৎপরতা ক্রমশ বাড়ছে। সেই আবহেই টালিগঞ্জের পুরসভার অনুষ্ঠানে দাঁড়িয়ে পূর্বতন সরকারের বিরুদ্ধে সরব হলেন শুভেন্দু। তাঁর দাবি, কলকাতা ও তার আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় একের পর এক পুকুর বুজিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে শহরের পরিবেশ এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

### ‘পাঁচ হাজার পুকুর বুজিয়েছে পূর্বতন সরকার’

অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, জোকা, হরিদেবপুর থেকে শুরু করে বারাসত ও মধ্যমগ্রাম পর্যন্ত কলকাতা মেট্রোপলিটন ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (কেএমডিএ)-র আওতাধীন এলাকায় গত সরকারের আমলে প্রায় পাঁচ হাজার পুকুর বুজিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে তাঁর অভিযোগ। এই পরিস্থিতির জন্য পূর্বতন সরকারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কাউন্সিলরদেরও দায়ী করেছেন তিনি।

শুভেন্দুর কথায়, ‘‘জোকা, হরিদেবপুর থেকে বারাসত, মধ্যমগ্রাম পর্যন্ত কেএমডিএ-র এলাকায় বিগত দিনে যে সরকার এবং স্কোয়ার ফিট কাউন্সিলরেরা ছিলেন, তাঁরা পাঁচ হাজার পুকুর বুজিয়েছেন। কলকাতার পরিবেশকে ধ্বংস করার জন্য যা যা করা দরকার, সব কাজই ওঁরা করেছেন।’’

মুখ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ, শহর ও শহরতলিতে জলাশয় ভরাটের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই পরিবেশপ্রেমী এবং নাগরিক সংগঠনগুলির উদ্বেগের অন্যতম বিষয়। জলাশয় হারিয়ে গেলে বৃষ্টির জল ধরে রাখার প্রাকৃতিক ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ জলস্তর, জীববৈচিত্র্য এবং স্থানীয় পরিবেশের উপরেও তার প্রভাব পড়তে পারে। সেই জায়গা থেকেই জলাশয় সংরক্ষণের বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন মুখ্যমন্ত্রী।

### ইটখোলার দুই জলাশয় সংস্কার, খরচ প্রায় সাড়ে ৯ কোটি টাকা

এ দিন শুধু পূর্বতন সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেই থেমে থাকেননি শুভেন্দু। টালিগঞ্জ বিধানসভা এলাকার ১১৪ নম্বর ওয়ার্ডে ইটখোলা-১ এবং ইটখোলা-২ নামে দুটি জলাশয় ও সবুজবলয় উদ্ধারের কাজের কথাও তুলে ধরেন তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কলকাতা পুরসভার ১১ নম্বর বরোর অন্তর্গত এই এলাকায় জলাশয় দুটির সংস্কার এবং সবুজবলয় পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

মুখ্যমন্ত্রী জানান, এই কাজের জন্য ভারত সরকার ও রাজ্য সরকার যৌথভাবে দুটি প্রকল্পে অর্থ বরাদ্দ করেছে। প্রথম প্রকল্পে খরচ হয়েছে ৫ কোটি ৭৯ লক্ষ ২৮ হাজার ৩২৯ টাকা। দ্বিতীয় প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ৩ কোটি ৫৮ লক্ষ ৮৭ হাজার ৯৮৮ টাকা।

দুটি প্রকল্পে মোট ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে ৯ কোটি ৩৮ লক্ষ ১৬ হাজার ৩১৭ টাকা। অর্থাৎ, প্রায় ৯ কোটি ৩৮ লক্ষ টাকা ব্যয়ে জলাশয় ও সবুজবলয় পুনরুদ্ধারের কাজ করা হয়েছে বলে অনুষ্ঠানে জানান মুখ্যমন্ত্রী।

তাঁর বক্তব্য, এই ধরনের উদ্যোগকে ছোট কাজ বলে দেখার কোনও কারণ নেই। বরং শহরের পরিবেশ রক্ষা এবং নাগরিকদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করার ক্ষেত্রে জলাশয় পুনরুদ্ধারের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।

### নতুন নাম ‘শিব জলাশয়’ ও ‘শক্তি জলাশয়’

সংস্কার করা জলাশয় দুটির নতুন নামকরণও করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর দেওয়া নাম অনুযায়ী, একটি জলাশয়ের নাম হয়েছে ‘শিব জলাশয়’ এবং অন্যটির নাম ‘শক্তি জলাশয়’।

জলাশয়গুলির পুনরুদ্ধারকে স্থানীয় পরিবেশের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরেছেন তিনি। শহর ও শহরতলিতে দ্রুত নগরায়ণের ফলে অনেক জায়গায় জলাশয় ও খোলা জমির পরিমাণ কমে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সেই পরিস্থিতিতে পুরনো জলাশয়গুলিকে পুনরুদ্ধার করা গেলে বৃষ্টির জল সংরক্ষণ, স্থানীয় পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা এবং সবুজ পরিসর বাড়ানোর ক্ষেত্রে সুবিধা হতে পারে।

মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে স্পষ্ট, জলাশয় সংরক্ষণকে তাঁর সরকার উন্নয়নমূলক কাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে। একই সঙ্গে পূর্বতন সরকারের আমলে জলাশয় ভরাটের অভিযোগ তুলে রাজনৈতিকভাবেও বিষয়টিকে সামনে আনা হচ্ছে।

### পুরভোটের আগে পরিবেশ ও উন্নয়নকে সামনে রেখে রাজনৈতিক বার্তা

কলকাতা পুরসভার নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, ততই শহরের নাগরিক পরিষেবা, নিকাশি ব্যবস্থা, জল জমার সমস্যা, রাস্তা এবং পরিবেশ সংরক্ষণের মতো বিষয়গুলি রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে পাঁচ হাজার পুকুর বুজিয়ে দেওয়ার অভিযোগ তুলে শুভেন্দু অধিকারী যে বার্তা দিলেন, তা পুরভোটের আগে রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে।

তবে পূর্বতন সরকারের আমলে পাঁচ হাজার পুকুর বুজিয়ে দেওয়ার যে অভিযোগ মুখ্যমন্ত্রী করেছেন, তার সমর্থনে বিস্তারিত নথি বা পৃথক পরিসংখ্যান অনুষ্ঠানে প্রকাশ করা হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। ফলে এই অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট সরকারি তথ্য এবং জলাশয় সংক্রান্ত নথি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

সব মিলিয়ে, টালিগঞ্জের এই পুরসভা অনুষ্ঠানে একদিকে যেমন ইটখোলা-১ ও ইটখোলা-২ জলাশয়ের সংস্কার এবং সবুজবলয় উদ্ধারের কাজকে তুলে ধরেছেন মুখ্যমন্ত্রী, অন্যদিকে তেমনই কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকার পরিবেশ ধ্বংসের জন্য পূর্বতন তৃণমূল সরকারকে দায়ী করেছেন তিনি। আগামী কলকাতা পুরসভার নির্বাচনে জলাশয় সংরক্ষণ, পরিবেশ রক্ষা এবং নাগরিক পরিষেবার প্রশ্নগুলি কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, এখন সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের।

Post a Comment

Previous Post Next Post