ভোটের ফল প্রকাশের আগেই কার্যত হার স্বীকার করে নিলেন নওদার বিধায়ক তথা আম জনতা উন্নয়ন পার্টির প্রধান হুমায়ুন কবীর। রেজিনগর বিধানসভা উপনির্বাচনে ভোটের নামে ‘প্রহসন’ হয়েছে বলে অভিযোগ তুলে রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা করলেন তিনি। শুধু তাই নয়, রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ তুলে ‘অভিমানী’ হুমায়ুন জানিয়ে দিলেন, শুভেন্দু অধিকারী যত দিন মুখ্যমন্ত্রীর পদে থাকবেন, তত দিন তিনি বিধানসভার চৌকাঠ মাড়াবেন না।
মঙ্গলবার রেজিনগর উপনির্বাচনের দিন সকালেই পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়েছিলেন হুমায়ুন। দিনভর নানা টানাপড়েনের পর সন্ধ্যায় তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এই আসনটি হুমায়ুনের ছেড়ে দেওয়া আসন। উপনির্বাচনে তাঁর দলীয় প্রার্থী তাঁরই পুত্র গোলাম নবি আজ়াদ। ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর থেকেই হুমায়ুন-পুত্রের তরফে বিজেপির বিরুদ্ধে ভোটলুটের অভিযোগ তোলা হয়েছিল। তাঁর দাবি ছিল, ভোটের ফল কী হতে চলেছে, তা ভোটের দিনই কার্যত স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে।
কিন্তু বুধবার সকালে রেজিনগর নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সম্পূর্ণ অন্য মেজাজে দেখা গেল হুমায়ুনকে। বরাবরই আক্রমণাত্মক বক্তব্যের জন্য পরিচিত এই বিধায়ক এ দিন সংবাদমাধ্যমের সামনে নিজের বক্তব্য রাখতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। একসময় তাঁকে কাঁদতেও দেখা যায়। সেই অবস্থাতেই তিনি দাবি করেন, রেজিনগরে বিজেপি বিপুল ভোটে জয়ী হতে পারে। কিন্তু সেই জয়কে তিনি কোনও ভাবেই মানুষের প্রকৃত রায় বলে মানতে নারাজ।
হুমায়ুনের অভিযোগ, রেজিনগরে সাধারণ মানুষের ভোটকে প্রভাবিত করা হয়েছে। তাঁর দাবি, রাজ্য পুলিশ এবং প্রশাসনকে ব্যবহার করে ভোট ‘চুরি’ করা হয়েছে। তাই এমন একটি ব্যবস্থার মধ্যে থেকে আর রাজনীতি করার কোনও ইচ্ছা তাঁর নেই। সেই কারণেই তিনি স্বেচ্ছায় রাজনীতি থেকে অবসর নেওয়ার কথা ঘোষণা করেন।
হুমায়ুন বলেন, ‘‘রাজনীতি থেকে স্বেচ্ছাবসর নেব। এমন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়াই করা যায় না।’’ একই সঙ্গে নওদার সাধারণ মানুষের কাছেও ক্ষমা চেয়ে নেন তিনি। জানান, তাঁর এই সিদ্ধান্তের কারণে এলাকার মানুষকে হয়তো সমস্যায় পড়তে হতে পারে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁর পক্ষে আর সক্রিয় রাজনীতিতে থাকা সম্ভব নয় বলেই দাবি তাঁর।
এর পরেই বিধানসভা নিয়ে আরও বড় ঘোষণা করেন হুমায়ুন। তিনি বলেন, শুভেন্দু অধিকারী যত দিন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী থাকবেন, তত দিন তিনি বিধানসভায় যাবেন না। অর্থাৎ বিধায়ক পদে থাকলেও বিধানসভার অধিবেশনে যোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন তিনি। রেজিনগরের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তাঁর ক্ষোভ যে কতটা গভীর, এই ঘোষণাতেই তার ইঙ্গিত মিলেছে।
হুমায়ুনের আরও দাবি, রেজিনগরের নির্বাচনে তাঁর ছেলে গোলাম নবি আজ়াদের জয়ের বিষয়ে নবান্নে তাঁকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তাঁর দাবি, মুখ্যমন্ত্রী তাঁকে কথা দিয়েছিলেন যে তাঁর ছেলে অন্তত ৩০ হাজার ভোটে জিতবেন। কিন্তু সেই ‘কথা রাখা হয়নি’ বলেই অভিযোগ হুমায়ুনের। যদিও এই দাবির বিষয়ে সরকারের তরফে কোনও প্রতিক্রিয়া এখনও সামনে আসেনি।
তবে রাজনীতি ছাড়ার ঘোষণা করলেও একটি বিষয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট রেখেছেন হুমায়ুন। মুর্শিদাবাদে বাবরি মসজিদ নির্মাণের যে প্রতিশ্রুতি তিনি আগেই দিয়েছিলেন, তা থেকে সরে আসছেন না বলে জানিয়েছেন তিনি। অর্থাৎ সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে যাওয়ার কথা বললেও ওই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ব্যাপারে তিনি এখনও অনড়।
রেজিনগর উপনির্বাচনের ফল প্রকাশের আগেই হুমায়ুনের এই ঘোষণা স্বাভাবিক ভাবেই রাজনৈতিক মহলে নতুন জল্পনা তৈরি করেছে। একদিকে ভোটের দিন তাঁর গ্রেফতারি, অন্য দিকে ভোটে অনিয়মের অভিযোগ এবং তার পরেই রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা—সব মিলিয়ে রেজিনগর উপনির্বাচনকে ঘিরে উত্তাপ আরও বাড়ল। এখন দেখার, ফল প্রকাশের পর হুমায়ুনের এই অবস্থান কতটা বদলায়, নাকি সত্যিই সক্রিয় রাজনীতি থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন তিনি।