ভারত-নেপাল সীমান্ত নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক নতুন করে আলোচনায়। আর সেই বিতর্কের মধ্যেই সামনে এসেছে প্রায় ২১০ বছরের পুরনো একটি গুরুত্বপূর্ণ নথি নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য। ১৮১৬ সালের সুগৌলি চুক্তির মূল নথি বর্তমানে নেপালের কাছে কোথায় রয়েছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য নেই বলে জানিয়েছেন দেশটির বিদেশমন্ত্রী শশীর খানাল। ঐতিহাসিক এই চুক্তিই ভারত ও নেপালের পশ্চিম সীমান্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
কী এই সুগৌলি চুক্তি?
১৮১৪-১৬ সালের অ্যাংলো-নেপাল যুদ্ধের পর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং নেপালের মধ্যে ১৮১৬ সালে সুগৌলি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির মাধ্যমে নেপালের সীমানার একটি বড় অংশ নির্ধারিত হয়েছিল। বিশেষ করে পশ্চিম সীমান্তে কালী নদীকে কেন্দ্র করে যে সীমানা নির্ধারণের কথা বলা হয়েছিল, বর্তমান ভারত-নেপাল সীমান্ত বিতর্কের অন্যতম মূল সূত্র সেখানেই।
তবে সমস্যা হল, চুক্তিতে কালী নদীর উৎসস্থল ঠিক কোথায়—তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হয়নি। এই অস্পষ্টতাই পরবর্তী সময়ে লিপুলেখ, কালাপানি এবং লিম্পিয়াধুরা নিয়ে দুই দেশের ভিন্ন দাবির অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ পুরনো নথি?
নেপালের দাবি, ঐতিহাসিক নথি ও মানচিত্র তাদের পক্ষে প্রমাণ দেয় যে লিপুলেখ, কালাপানি এবং লিম্পিয়াধুরা নেপালের ভূখণ্ডের অন্তর্ভুক্ত। অন্যদিকে ভারত এই দাবি মানে না। ভারতের অবস্থানের পক্ষে ঐতিহাসিক প্রশাসনিক ও রাজস্ব নথির উল্লেখ করা হয়, যার মধ্যে ১৮৩০-এর দশকের রেকর্ডও রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সুগৌলি চুক্তির মূল নথি এবং সংশ্লিষ্ট পুরনো মানচিত্রের গুরুত্ব অনেকটাই বেড়ে যায়। নেপাল সরকার ব্রিটিশ আর্কাইভ থেকেও ঐতিহাসিক নথি সংগ্রহের চেষ্টা করছে। তবে কাঠমান্ডু স্পষ্ট করেছে যে ব্রিটেনের কাছে নথি চাওয়ার অর্থ কোনও তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে ভারত-নেপাল সীমান্ত সমস্যা মেটানোর আবেদন নয়। দুই দেশই দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের পক্ষে।
বিতর্ক ফের উত্তপ্ত কেন?
লিপুলেখ, কালাপানি ও লিম্পিয়াধুরা নিয়ে ভারত-নেপাল বিরোধ নতুন নয়। ২০২০ সালে নেপাল একটি নতুন রাজনৈতিক মানচিত্র প্রকাশ করে, যেখানে ওই অঞ্চলগুলিকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ হিসেবে দেখানো হয়েছিল। এরপর থেকেই কূটনৈতিক টানাপড়েন আরও বেড়েছে।
২০২৬ সালে নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহও সীমান্ত প্রসঙ্গে নতুন মন্তব্য করেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে, শুধু ভারত নেপালের ভূখণ্ডে প্রবেশ করেছে এমন নয়, নেপালের দিক থেকেও ভারতের দাবিকৃত কিছু এলাকায় অনুপ্রবেশের প্রশ্ন থাকতে পারে। তাঁর মন্তব্য দুই দেশের সীমান্ত বিতর্ককে ফের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে।
শুধু পুরনো দলিল নয়, মাঠপর্যায়ের সমস্যাও রয়েছে
ভারত-নেপাল সীমান্তের বিভিন্ন অংশে সীমান্তস্তম্ভ হারিয়ে যাওয়া বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনাও দীর্ঘদিনের সমস্যা। নেপালের বিদেশমন্ত্রী জানিয়েছেন, হারিয়ে যাওয়া সীমান্তস্তম্ভ পুনর্নির্মাণ ও মেরামতের কাজ চলছে এবং যৌথ ফিল্ড সার্ভে টিম বিভিন্ন এলাকায় কাজ করছে। ২০২৬ সালের অগস্টে দুই দেশের যৌথ সীমান্ত ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত বৈঠক হওয়ার কথাও রয়েছে।
এদিকে সুস্তা অঞ্চলেও নদীর গতিপথ পরিবর্তনের কারণে সীমান্ত নির্ধারণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সমস্যা রয়েছে। ভারতীয় সংসদে দেওয়া এক সরকারি উত্তরে এই অঞ্চলের সীমান্ত-সমস্যার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল এবং সীমান্তস্তম্ভ ও নদীর গতিপথ-সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে যৌথভাবে কাজ করার কথা জানানো হয়েছিল।
তাহলে নেপাল কি সত্যিই ‘চাপে’?
মূল নথির অবস্থান নিয়ে নেপালের কাছে পরিষ্কার তথ্য না থাকা নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক নথিপত্রের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। কিন্তু শুধু একটি নথি পাওয়া যাচ্ছে না বলেই নেপালের সীমান্ত-দাবি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়—এমনটা বলা ঠিক হবে না। কারণ সীমান্ত নির্ধারণে শুধু একটি চুক্তি নয়, পরবর্তী সময়ের মানচিত্র, প্রশাসনিক রেকর্ড, রাজস্ব নথি, সীমান্তস্তম্ভ এবং দুই দেশের দীর্ঘদিনের কার্যকর নিয়ন্ত্রণও বিবেচনায় আসতে পারে।
তাই সুগৌলি চুক্তির মূল কপি নিয়ে বিতর্ক যতই চাঞ্চল্যকর হোক, ভারত-নেপাল সীমান্ত সমস্যার সমাধান শুধুমাত্র ওই একটি নথির ওপর নির্ভর করছে না। বরং ইতিহাস, মানচিত্র, প্রশাসনিক প্রমাণ এবং বর্তমান সীমান্ত ব্যবস্থাপনা—সবকিছুকে সামনে রেখেই দুই দেশের আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খুঁজতে হবে।
সারকথা: প্রায় ২১০ বছর আগের সুগৌলি চুক্তির মূল নথির অবস্থান নিয়ে নেপালের বক্তব্য নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। তবে এই নথি ‘হারিয়ে যাওয়া’ মানেই চুক্তি বা তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব অস্বীকার করা নয়। বরং ঘটনাটি দেখিয়ে দিচ্ছে, ভারত-নেপাল সীমান্তের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক নথি সংরক্ষণ এবং যৌথভাবে সীমান্ত-প্রমাণ যাচাই কতটা গুরুত্বপূর্ণ।