বোলপুরে ফের চাঞ্চল্য। অনুব্রত মণ্ডলের প্রাক্তন দেহরক্ষী সায়গল হোসেনকে গ্রেফতার করল বীরভূম জেলা পুলিশ। বোলপুর বাইপাস সংলগ্ন একটি আবাসনে তাঁর ফ্ল্যাটে তল্লাশি চালিয়ে উদ্ধার হয়েছে বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা, সোনা এবং গুরুত্বপূর্ণ নথি। পুলিশ সূত্রে খবর, প্রায় ২২ ঘণ্টা ধরে জিজ্ঞাসাবাদের পর সায়গলকে গ্রেফতার করা হয়। রবিবার তাঁকে বীরভূমের সিউড়ি আদালতে পেশ করার কথা।
ফ্ল্যাট থেকে কত টাকা উদ্ধার?
পুলিশের দাবি, সায়গলের ফ্ল্যাট থেকে নগদ ১৩ লক্ষ টাকা উদ্ধার হয়েছে। পাশাপাশি মিলেছে ৭৫০ গ্রামেরও বেশি সোনা। উদ্ধার হয়েছে ৩০০-র বেশি গুরুত্বপূর্ণ দলিল ও নথিও। এই বিপুল নগদ, সোনা এবং নথির উৎস কী, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
শিরোনামে প্রায় ৮০০ গ্রাম সোনা উদ্ধারের কথা বলা হলেও, পুলিশের সূত্র উদ্ধৃত করে প্রকাশিত প্রতিবেদনে সুনির্দিষ্টভাবে ৭৫০ গ্রামের বেশি সোনার কথা জানানো হয়েছে।
কীভাবে তদন্তে উঠে এল সায়গলের নাম?
ঘটনার সূত্রপাত একটি কথিত ভুয়ো DCR ব্যবহার করে রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগের তদন্ত থেকে। পাথর ব্যবসায়ী টুলু মণ্ডলের বিরুদ্ধে পাথর ও বালি বোঝাই গাড়িতে ভুয়ো DCR ব্যবহার করে সরকারের কোটি কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগের তদন্ত করছে বীরভূম জেলা পুলিশ। সেই তদন্তের সূত্র ধরেই টুলু মণ্ডলের শ্যালক মিঠু শেখের বাড়ি ও ফ্ল্যাটে তল্লাশি চালানো হয়।
তদন্তকারীরা সেই আবাসনেই সায়গলের ফ্ল্যাটে অভিযান চালান। এরপর দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদ এবং তল্লাশিতে সামনে আসে নগদ টাকা, সোনা ও বিপুল সংখ্যক নথির বিষয়টি। সায়গলের সঙ্গে টুলু মণ্ডলের কোনও আর্থিক যোগ রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে।
সায়গল হোসেন কে?
সায়গল হোসেন একসময় বীরভূমের তৎকালীন তৃণমূল জেলা সভাপতি অনুব্রত মণ্ডলের দেহরক্ষী ছিলেন। গরু পাচার মামলার তদন্তেও তাঁর নাম সামনে আসে। সেই মামলায় সিবিআই তাঁকে গ্রেফতার করেছিল। পরবর্তী সময়ে ইডিও তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত করে। প্রায় আড়াই বছর জেলে থাকার পর তিনি জামিনে মুক্ত ছিলেন।
আগের তদন্তগুলিতেও সায়গলের বিপুল সম্পত্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। সিবিআই ও ইডির তদন্তে তাঁর নামে একাধিক স্থাবর সম্পত্তির সন্ধান পাওয়ার কথা বিভিন্ন সময়ে প্রকাশ্যে এসেছে। ২০২৪ সালে গরু পাচার মামলায় দিল্লি হাইকোর্ট তাঁকে জামিনও দিয়েছিল।
এবার তদন্তের কেন্দ্রে কী?
এবার পুলিশের মূল প্রশ্ন—সায়গলের ফ্ল্যাটে পাওয়া ১৩ লক্ষ টাকা, ৭৫০ গ্রামের বেশি সোনা এবং ৩০০-রও বেশি নথি কোথা থেকে এল? এগুলির সঙ্গে ভুয়ো DCR ব্যবহার করে রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগের কোনও যোগ রয়েছে কি না, সেটিই এখন তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক।
পাশাপাশি টুলু মণ্ডল এবং তাঁর ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে সায়গলের কোনও আর্থিক লেনদেন হয়েছিল কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। উদ্ধার হওয়া নথি থেকে আরও কোনও আর্থিক লেনদেন বা সম্পত্তির তথ্য সামনে আসে কি না, এখন সেদিকেই নজর তদন্তকারীদের।
পুরনো ছায়া, নতুন মামলা
অনুব্রত মণ্ডলের প্রাক্তন দেহরক্ষীকে ঘিরে নতুন করে নগদ ও সোনা উদ্ধারের ঘটনায় বীরভূমের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে ফের চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। তবে উদ্ধার হওয়া সম্পত্তি বেআইনি বা কোনও অপরাধের অর্থ—এমন সিদ্ধান্তে এখনই পৌঁছনো যাচ্ছে না। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সম্পত্তির উৎস এবং সায়গলের প্রকৃত ভূমিকা সম্পর্কে চূড়ান্ত কোনও দাবি করা সম্ভব নয়।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—১৩ লক্ষ টাকা নগদ, ৭৫০ গ্রামের বেশি সোনা এবং শতাধিক গুরুত্বপূর্ণ নথি উদ্ধারের ঘটনা নতুন করে একাধিক প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই এখন তদন্তকারীদের নজর সায়গলের আর্থিক লেনদেন, সম্পত্তি এবং পুরনো যোগাযোগের দিকে।