এশিয়ান গেমসের শেষ পর্বেও বিতর্ক পিছু ছাড়ল না জাপানের। নাগোয়ায় অনুষ্ঠিত গেমসের শুরু থেকেই খেলোয়াড়দের থাকা, খাওয়া এবং যাতায়াতের ব্যবস্থা নিয়ে একের পর এক অভিযোগ সামনে এসেছে। ভারত, পাকিস্তান, দক্ষিণ কোরিয়া, উজ়বেকিস্তান-সহ একাধিক দেশের খেলোয়াড়েরা আয়োজকদের অব্যবস্থা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। এ বার গেমসের শেষ বেলাতেও সেই বিতর্কের ছায়া দেখা গেল। তবে এ বার অভিযোগ আরও স্পর্শকাতর—পুরস্কার বিতরণীর সময় দক্ষিণ কোরিয়ার জাতীয় পতাকাই আটকে গেল মাঝপথে!
ঘটনাটি ঘটে ছেলেদের ফুটবলের ফাইনালের পর পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে। ফাইনালে আয়োজক দেশ জাপানকে ১-০ গোলে হারিয়ে সোনা জেতে দক্ষিণ কোরিয়া। ঘরের মাঠে রুপো নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয় জাপানকে। তৃতীয় হয়ে ব্রোঞ্জ পায় চিন। ম্যাচের পর নিয়ম মেনে তিন দেশের পদকজয়ী দলকে পুরস্কৃত করা হয়। এরপর তিন দেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলনের পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়ার জাতীয় সঙ্গীত বাজানোর কথা ছিল।
কিন্তু জাতীয় পতাকা উত্তোলনের সময়ই ঘটে বিপত্তি। জাপান এবং চিনের জাতীয় পতাকা কোনও সমস্যা ছাড়াই নির্দিষ্ট উচ্চতায় উঠে গেলেও দক্ষিণ কোরিয়ার পতাকা কিছুটা ওঠার পর আচমকাই পোলের মাঝখানে আটকে যায়। আয়োজকদের কর্মীরা বার বার চেষ্টা করেও সেটিকে উপরে তুলতে পারেননি। ফলে জাতীয় সঙ্গীত বাজতে শুরু করলেও দক্ষিণ কোরিয়ার পতাকা তখনও পুরোপুরি উত্তোলিত হয়নি।
ঘটনাটি দেখে গ্যালারিতে থাকা দক্ষিণ কোরিয়ার সমর্থকদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। তাঁরা আয়োজকদের উদ্দেশে বিদ্রুপ করতে শুরু করেন। সোনাজয়ী দলের পতাকা ঠিক ভাবে উত্তোলন করতে না পারায় ক্ষোভ আরও বাড়তে থাকে। দক্ষিণ কোরিয়ার খেলোয়াড়দের মধ্যেও বিষয়টি নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়।
পুরস্কার বিতরণী মঞ্চে দাঁড়িয়েই পরিস্থিতিটি দেখতে হয় দক্ষিণ কোরিয়ার ফুটবলারদের। দলের অধিনায়ক লি জি হিউক পরে এই ঘটনায় হতাশা প্রকাশ করেন। তাঁর বক্তব্য, একটি দেশের কাছে জাতীয় পতাকা এবং জাতীয় সঙ্গীত অত্যন্ত আবেগের বিষয়। সেই মুহূর্তটিকেই তাঁরা সোনাজয়ের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন। অথচ সেখানে এমন একটি ঘটনা ঘটায় তাঁদের উদ্যাপনে ছন্দপতন হয়েছে।
লি বলেন, ‘‘আমি মনে করি পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান উদ্যাপনের উপলক্ষ হওয়া উচিত। এই পদকটা জেতার জন্য আমরা কঠোর পরিশ্রম করেছি। অথচ আয়োজকেরা আমাদের দেশের পতাকাটাও ঠিক মতো তুলতে পারলেন না। বিষয়টা অত্যন্ত হতাশাজনক।’’
তিনি আরও বলেন, এই ঘটনায় শুধু ফুটবলাররাই নন, সমর্থকেরাও ক্ষুব্ধ হয়েছেন। কারণ, তাঁদের অনেক সমর্থক বহু দূর থেকে জাপানে এসেছিলেন দলকে সমর্থন করার জন্য। লির কথায়, ‘‘আমি নিশ্চিত ফুটবলারদের পাশাপাশি আমাদের সমর্থকেরাও ক্ষুব্ধ হয়েছেন। তাঁরা অত দূর থেকে জাপানে এসেছেন শুধু আমাদের সমর্থন করবেন বলে।’’
দক্ষিণ কোরিয়ার সংবাদমাধ্যমের দাবি, জাতীয় সঙ্গীত শেষ হওয়ার পর শেষ পর্যন্ত পতাকাটি সম্পূর্ণ ভাবে উত্তোলন করা সম্ভব হয়। তবে ততক্ষণে পুরস্কার বিতরণীর গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তটি কার্যত নষ্ট হয়ে গিয়েছে। ঘটনাটি নিয়ে আয়োজকদের বিরুদ্ধে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
এমনিতেই নাগোয়া এশিয়ান গেমসের ব্যবস্থাপনা নিয়ে গেমস চলাকালীন একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে। অ্যাথলিটদের পরিবহণ, থাকার জায়গা, খাবার এবং বিভিন্ন পরিষেবা নিয়ে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের অসন্তোষের খবর প্রকাশ্যে এসেছে। সেই আবহেই এবার পদক বিতরণীর মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন নিয়েও সমস্যা দেখা দেওয়ায় আয়োজকদের ভূমিকা নিয়ে ফের প্রশ্ন উঠল।
তবে মাঠের পারফরম্যান্সে কোনও খামতি রাখেনি দক্ষিণ কোরিয়া। ফাইনালে জাপানকে হারিয়ে তারা শুধু সোনা জেতেনি, ছেলেদের ফুটবলে টানা চতুর্থ বার এশিয়ান গেমসের চ্যাম্পিয়ন হল। ফলে ঐতিহাসিক সাফল্যের আনন্দের মাঝেও পতাকা উত্তোলনের এই ঘটনা দক্ষিণ কোরিয়ার দলের কাছে যথেষ্ট হতাশার হয়ে থাকল।
নাগোয়া এশিয়ান গেমস শেষের পথে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে দক্ষিণ কোরিয়ার জাতীয় পতাকা নিয়ে তৈরি হওয়া এই বিতর্ক ফের এক বার সামনে এনে দিল আয়োজকদের ব্যবস্থাপনা নিয়ে ওঠা প্রশ্নগুলি। মাঠে সোনার পদক জিতেও তাই গেমসের শেষ দিনে পুরোপুরি বিতর্কমুক্ত থাকতে পারল না জাপান।